নজরুল কাব্যের ফার্সী অনুবাদ: একটি দ্বিখণ্ডিত স্বত্ত্বা আনিসুর রহমান স্বপন
১৯৯৫ সালের ১০ হতে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমী রাফসানজানী রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে অবস্থান করেন।
এ সময়ে ঢাকাস্থঃ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক ও সাংস্কৃতিক এ্যাটাচী আলী আভারসাজীর উদ্যোগে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ফার্সি ভাষায় অনুদিত বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী ও কাব্য সংকলন।
সংকলনটির ফার্সী নাম হচ্ছে ‘গুজিদেহ আহওয়াল ওয়া আছারে কাজী নজর-আল-ইসলাম (শায়েরে মিল্লীয়ে বাংলাদেশ)’। অর্থাৎ (বাংলাদেশের জাতীয় কবি) কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও রচনা সংকলন।
এ গ্রন্থের সূচীপত্রের পর ফার্সীতে ৪ পৃষ্ঠাব্যাপী এক ভূমিকায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ঢাকাস্থঃ তৎকালীন কালচারাল এ্যাটাচী আলী আভারসাজী এ গ্রন্থটির প্রকাশনা উদ্যোগ বর্ণনা করতে গিয়ে মরহুম মনির উদ্দীন ইউসুফ অনূদিত ‘শাহনামা’ মহাকাব্যের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন- ‘ফার্সীতে লেখা ইরানের জাতীয় কবি ফেরদৌসীর মহান সাহিত্য কর্ম শাহনামার বঙ্গানুবাদ করে বাংলার জনগণের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার বিপরীতে আমরাও বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জীবনী ও সাহিত্য কর্ম ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করে ইরানের মুসলমান জনগণ ও দুনিয়ার ফার্সী ভাষীদের কাছে পেশ করব।’
ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ নদীতে খেয়া পারের তরণী এবং নজরুলের প্রতিকৃতি সম্বলিত চাররঙা সুশোভন প্রচ্ছদ এবং ডিমাই সাইজের অফসেট কাগজে ১৪৫ পৃষ্ঠার (২) দু’হাজার কপি পরিপাটি মুদ্রণের এ গ্রন্থটির জন্য নজরুল কাব্য সংকলন ও অনুবাদ করেছেন দীর্ঘদিন ধরে রেডিও তেহরানের বাংলা অনুষ্ঠানে কাজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সী বিভাগে অধ্যয়ন ও গবেষণার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ সুপন্ডিত মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী। তাকে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দ্দু ও ফার্সী বিভাগের প্রফেসর ডঃ কুলসুম আবুল বাশার এবং গ্রন্থটি সার্বিক সম্পাদনা করেছেন ঐ বিভাগে আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসেবে তৎকালে কর্মরত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ইয়াজদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গবেষক ডঃ মুহাম্মদ কাজেম কাহদুয়ী।
তিনি বাংলার বুলবুল কবি নজরুল স্মরণে শীর্ষক ৪ (চার) পৃষ্ঠার এক ফার্সী প্রাক-কথনে লিখেছেন ‘নজরুলও ছিলেন সর্বকালের অবস্থানে মুক্তির জয় গানে সোচ্চার ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে আখ্যায়িত হন। তিনি যখনি দেখলেন মানুষ এখনো জাগছেনা তখন ‘মহররম’ কবিতার মাধ্যমে ইমাম হোসাইনের বীরত্ব গাঁথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। … তিনি যদি নীরবতা পালন করে মুক্তি, স্বাধীনতা প্রভৃতির পক্ষে কোন কথা না বলতেন তা হলে হয়ত নোবেলের মত কোন বড় পুরস্কারে তিনিও ভূষিত হতেন। … তিনি স্বাধীনতার জন্য শিকল পরা ও বন্দিদশাকে যে কোন পুরস্কার গ্রহণের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ ভূখন্ডের সমকালীন কবিতায় তিনি অপর যে বিপ্লবটি সাধন করেন তা হলো ফার্সী ও ইসলামী শব্দ এবং পরিভাষার চমৎকার ব্যবহার। … নজরুলের অপর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি হাফেজ ও খৈয়ামের মত ফার্সী কবিদের কাছ হতে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। … অথচ পৃথিবীর আরো অনেক বড়ো বড়ো কবি আছেন, যারা ফার্সী ভাষায় রচিত ইরানি কবি ও সাধকদের চিন্তা-চেতনায় উপকৃত ও অনুপ্রাণীত হলেও এতটুকুও ঋণ স্বীকার করেননি।’
উভয়ের এ বক্তব্যের পরে রয়েছে ‘নজর-আল-ইসলাম শায়েরে মিল্লীয়ে বাংলাদেশ’ (নজরুল ইসলামঃ বাংলাদেশের জাতীয় কবি) শীর্ষক ৫৪ পৃষ্ঠা ব্যাপী নজরুল জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন বিষয়ক ২৫টি ছোট ছোট ভাগ ও স্বতন্ত্র শিরোনামে বিভক্ত অধ্যায়।
নজরুল জীবনীর এ অধ্যায়টি সংক্ষিপ্ত হলেও প্রামান্য এবং তথ্য সমৃদ্ধ। এতে রবীন্দ্রনাথকে নজরুলের চেয়ে বড়ো কবি হিসেবে স্বীকার করা হলেও একজনকে মূলতঃ ভারতীয় হিন্দু এবং অপরজনকে বাংলাদেশী মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করার মানসিকতা ধরা পড়েছে।
সংস্কৃতি ও হিন্দী শব্দবহুল বাংলা ভাষায় আরবী-ফার্সী শব্দের ব্যাপক ও সার্থক ব্যবহার এবং ইসলামী ভাব ও বিষয় সমৃদ্ধ প্রচুর কবিতা ও সংগীত রচনার কারণে নজরুল ইসলামও মুসলমানদের কবি, বাংলার বুলবুল হিসেবে এ ফার্সী গ্রন্থটিতে চিত্রিত হয়েছেন।
নজরুলের উদার মানবতা ও সাম্যবাদী অসাম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ চিন্তা-চেতনা ও কর্মের উল্লেখ থাকলেও কবির সে জাতীয় কোনো রচনা এ গ্রন্থে সংকলিত হয়নি।
নজরুলের বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, আপোষহীন সংগ্রামী এবং রুশ বলশেভিক পন্থী সাম্যবাদী চরিত্রের কথা ফার্সী জীবনী অংশে বার বার বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় কবি এবং নোবেল পুরস্কার পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী মুসলমানদের ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে কোন সার্থক সাহিত্য ও সংগীত রচনা করেননি। বরং ইসলাম ও মুসলমান বিরোধীদের সমর্থন এবং বৃটিশদের প্রশস্তি গেয়েছেন বলে নজরুলের ফার্সী জীবনীকার উল্লেখ করেছেন।
আরবী ফার্সী শব্দের ব্যবহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিরোধী এবং নজরুলের জবাব, হিন্দু মেয়ের সাথে নজরুলের বিবাহ, তার সাথে ঘর সংসার এবং মৃত্যু পরবর্তীকালে প্রমীলাকে দাহ করার বদলে কবরস্থ কারা বিষয়টি ও জীবনীকারের দৃষ্টি এড়ায়নি। পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যুর পরে নজরুলের মধ্যে ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক ভাব প্রবলতর হয় এবং কবিতা ও সংগীতের মধ্যে ডুবে গিয়ে তিনি মানসিক প্রশান্তি খুঁজে বেড়ান।
মোঘল আমলে পাটনা হতে বর্ধমানে আগমন এবং স্থানীয় কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী পূর্ব পুরুষদের পেশাগত উপাধিই পরে নজরুলের বংশীয় উপাধিতে পরিণত হয়। দরিদ্র পিতা ফকির আহদের ঔরসে এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খানমের গর্ভে জন্ম নেয়া নজরুলের ছিল ৭ ভাই ২ বোন।
নজরুল ছিলেন মাতার দ্বিতীয় এবং পিতার ৫ম পুত্র। জন্মের আগে আপন ও সৎ ভাই মিলিয়ে ৪ ভাইয়ের মুত্যু হওয়ায় নজরুলের ডাক নাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’। ৮ বছর বয়সেই তিনি পিতৃহারা হন। নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষা, পারিবারিক আবহ এবং অর্থনৈতিক দারিদ্র নজরুলকে বিভিন্ন সময়ে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী চিন্তা চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং আপোষহীন সংগ্রামী করে তোলে বলে ফার্সী জীবনীকার মনে করেন।
কিন্তু ফার্সী জীবনীকারের এ পর্যবেক্ষণ নজরুলের কাব্য-সংকলন ও অনুবাদকের খুব একটা মনোযোগ পায়নি। ফলে বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের অমুসলিমদের পুরাণ, ঐতিহ্য ইতিহাস ও মনীষিদের নিয়ে লেখা কোন কবিতা এ সংকলনে নেই। ধর্ম নিরপেক্ষতা ও প্যানতুর্কীজমের প্রবক্তা হওয়ার কারণে ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার’ কবিতা স্থান পায়নি।
নাস্তিক্যবাদ ও সাম্যবাদী চিন্তা চেতনার জন্য বাদ পড়েছে বিদ্রোহী, আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, পূজারিণী, বিজয়িনী, সর্বহারা, সাম্যবাদী, মানুষ, নারী, কুলিমজুর, ফরিয়াদ, আমার কৈফিয়ৎ, সব্যসাচী, সিন্দু, অ-নামিকা, দারিদ্র, ইন্দ্রপতন, পাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি, ঝিঙেফুল, খুকু ও কাঠবিড়ালী, খাদু দাদু, প্রভাতী, লিচু চোর, ঈদ মোবারক, অগ্রপথিক, চিরঞ্জীব, জগলুল, জীবন বন্দনা, চল্ চল্ চল্, যৌবন জল তরঙ্গ প্রভৃতি নজরুলের শ্রেষ্ঠ কবিতা-গান এ সংকলনে নেই। ইরান বিরোধী প্যান আরবীজমের কারণে ‘শাতিল-আরব’ কবিতার জায়গা হয়নি এতে।
ফার্সী সংকলনটিতে রয়েছেঃ
১) আল্লাহ প্রভু, আমরা নাহি ভয়,
২) সাহারাতে ফুটলরে রঙিনগুলে লাল,
৩) তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে,
৪) দীন-দরিদ্র কাঙালের তরে এই দুনিয়ায় আসি,
৫) আয় মরু পারের হাওয়া, নিয়ে যারে মদিনায়,
৬) বাজল কিরে ভোরের সানাই নিদ মহলের আধার পুরে,
৭) তুই আমায় ভালবাস তাই, আমি কবি,
৮) আজি গানে গানে ঢাকব আমার গভীর অভিমান,
৯) আঁখি বারি আঁখিতে থাক, থাক ব্যথা হৃদয়ে,
১০) খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে বেহুশ হয়ে রই পড়ে,
১১) আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমান,
১২) ওগো প্রিয়তমা! এত প্রেম দিওনাগো, সহিতে পারিনা আর,
১৩) বাগিচার বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল,
১৪) রাখিসনে ধরিয়া মোরে, ডেকেছে মদিনা আমায়,
১৫) মোহাররমের চাঁদ এল কাঁদাতে ফেরে দুনিয়ায়,
১৬) ভুবন জয়ী তোরা কি হায় সেই মুসলমান,
১৭) লায়লী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনুগো, আঁখি খোল,
১৮) বক্ষে আমার কাবার ছবি,
১৯) দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার,
২০) ফাতেহা-ই-দোয়াজ দাহম- এ বিশটি কবিতা ও গানের অনুবাদ।
বাছাইয়ের মত অনুবাদের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা লক্ষণীয়। আর সে দুর্বলতা ফার্সী ভাষাগত নয়; বরং বাংলা কবিতার ভাব অনুধাবনগত ক্ষেত্রেই প্রকট। কবিতার অনুবাদে তাই আড়াই হাজার বছরের পুরাতন ফার্সী সাহিত্যের বিপরীতে মাত্র কয়েক’শ বছরের পুরনো বাংলা সাহিত্যের এক ‘জাতীয় কবি’ নেহায়েত দীন-দরিদ্রভাবে উপস্থাপিত হয়েছেন। গ্রন্থটির আঙ্গিকগত জৌলুস ও পরিপাট্য কবিতার ভাব ও মানগত দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি।
ফার্সীতে রচিত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ কাব্য সংকলনে অনুদিত কবিতা ও গানের বাছাইতেই সুস্পষ্ট হয় তারা ফার্সী ভাষীদের পক্ষে নজরুলকে মানবতাবদী ধর্ম নিরপেক্ষ বিদ্রোহী কবি হিসেবে নয়- ইসলাম ও মুসলমানদের এবং ইরানীদের কাছে দায়বদ্ধ কবি হিসেবে পরিচিত করতে আগ্রহী। তাই নজরুল প্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে কোন মানের কবি হিসাবে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চান- সে নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ফার্সীতে নজরুলের জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন ও চর্চার উদ্যোগ যেন ধন্যবাদ যোগ্য তেমনি এ মহান কবির জীবন, কর্ম ও স্বত্ত্বাকে খন্ডিত ও সংকীর্ণ করে দেখা ও নিঃসন্দেহে অগ্রহনযোগ্য। কারণ ‘নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি’ এবং এর ফার্সী অনুবাদটি ছাপা হয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সরকারের পক্ষ হতে।
আমরা আশা করি ইসলামী ইরানের কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা এবং এর একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করবেন।
সব শেষে ফার্সী ভাষায় নজরুলের চর্চা শুরু করার জন্য আমরা এ প্রকাশনার সাথে জড়িত সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
 আনিসুর রহমান স্বপন
লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক
দীর্ঘদিন রেডিও ইরানে কাজ করেছেন।
সূত্র: আনন্দলিখন
|