কেঁপে কেঁপে জ্বলা অনন্ত স্মৃতি তুহিন দাস
(৩০ মার্চ ‘ভূবন বাড়ির ছেলে’ খ্যাত কবি অনন্ত জাহিদের চলে যাবার দিন। প্রচার বিমুখ ও আত্মঅভিমানি অনন্ত জাহিদ জম্মে ছিলেন ঢাকার উত্তর খানের নানা বাড়িতে। বেড়ে উঠেছিলেন নদী ও সমুদ্র বেষ্টিত দ্বীপ জেলা ভোলায়। তার উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ- আমি কি তোমার কাছে যেতে পারি, বাংলাদেশ মম, হৃদিনিন্দিতা তুমি ও ভুবন বাড়ির ছেলে। এছাড়াও তার একাধিক পান্ডুলিপি পরিবারের কাছে সংরক্ষিত আছে। ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ স্বেচ্ছামৃত্যুবরণ করেন। তাকে নিয়ে স্মৃতিরোমন্থন করেছেন অনন্ত জাহিদের বন্ধুপ্রতীম তুহিন দাস।)
অনন্ত জাহিদের কবিতা আমি প্রথম পড়েছিলাম কোন পত্রিকায় বা তার কবিতার বইয়ে নয়, তার কবিতা প্রথম পড়ি একটি টি-শার্টে। স্মৃতি যদি ভ্রম না হয়, তবে যতোদূর মনে পড়ে, নয়ের দশকের কবিদের কবিতা নিয়ে ক্রিম কালারের একটি টি-শার্ট বের করেছিলো ঢাকার নিত্য উপহার বা শাহবাগের অন্য কোন ফ্যাশন হাউজ। ২০০০/২০০১ সালের আমাদের শূন্য দশকের কবিতা লেখার প্রথম দিনগুলোয় আজিজ মার্কেটে বইয়ের দোকানে ঘুরতে ঘুরতে সেই টি-শার্ট দেখেছিলাম কারো পরণে।
কোন কবিতাটি ছিলো আজ আর মনে পড়ে না, তবে কেঁপে কেঁপে জ্বলে ওঠা যে ছবি আজও আমার মনের গহিনে দেখতে পাই তাতে মনে হয় ‘ও মাটি ও মেঘ’ এরকম শিরোনামের কোনো কবিতা ছিল। সে কথা থাক। কিন্তু ওভাবেই, টি-শার্টে তার কবিতা প্রথম পড়ে আমি উৎসাহি হয়ে উঠি। সেসময়ে ছোটকাগজ সহ বিভিন্ন দৈনিকে কবি অনন্ত জাহিদের কবিতা নিয়মিত ছাপা হতো। তারপর থেকে তার কবিতা নিয়মিত পড়তে শুরু করি।
আমি ‘আরণ্যক’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতাম, এ পত্রিকা ঘিরেই একসময়ে আমার সকল চাষবাস ছিলো। অনন্ত দা’র সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিলো এ পত্রিকার জন্য লেখা দেয়া নিয়ে। তিনি কথা রেখেছিলেন। তিনটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন।(লেখাগুলো অনেকদিন পরে, তার স্বেচ্ছামৃত্যুর পরে, ‘আরণ্যক’ পত্রিকার ১৪ এপ্রিল ২০১০ সংখ্যায় ছাপা হয়।)
কবিতাগুলির নাম : ‘কথার বদলে’, ‘বৃষ্টির অনুপ্রাস : বিদায় কফিল ভাই’, ‘অভিমান’। ‘কথার বদলে’ কবিতা থেকে কয়েকটি পঙক্তি পড়ি আজ ‘তবে, কেটে নাও জিভ/আর কোনো জন্মেও বলবো না/ফুল ফোটে আমাকে দেখার জন্য/দেখি/ দেখি…/ তোমার আয়নায় তুমি/ তুমি/ তুমি/ আমি/ আছো পল্লবিত সজীবতা/পাপড়ি/পরাগ/গর্ভমূল/শিকড়ের সূচাগ্রে/ফোটাও/ ফোটাও…/না-হয় মেহেদিরই ফুল/না-হয়/তুলে নাও মূল’। বরিশালের আরেক কবি অভিজিৎ দাসকে একটি ছোটগল্প ও একটি কাব্যনাটক দিয়েছিলেন। ছোটগল্পটির নাম ‘সিঁড়ি’। অভিজিৎ দাস গল্পটি বরিশালের ‘আলোকপত্র’ পত্রিকায় ছাপতে দেন।
গল্পটি ২০০৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল থেকে প্রকাশিত অনিয়মিত সাহিত্যপত্র ‘আলোকপত্র’ পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়। আর কাব্যনাটকটির নাম ছিলো ‘নয়ারচরের জীবনপুরাণ’। অনন্ত জাহিদের এই কাব্যনাটকটি অভিজিৎ ছাপার জন্য কোনো পত্রিকার দপ্তরে আমাকে পাঠাতে বলেন। এ নিয়ে অনন্ত দা’র সঙ্গে আমার কথা হয় ফোনে। তখন তিনি ভোলায় ছিলেন। তখন জানিয়েছিলেন তিনি বরিশালে আসবেন।
২০০৯ এর মার্চের প্রথম দিকেই বোধহয়, কোনো এক দুপুরবেলা তার ফোন পাই। ফোনালাপে জানতে পারি তিনি প্রেসের কাজে বরিশালে এসেছেন এবং হাসপাতাল রোডের যে প্রেসে তিনি কাজ করাতে এসেছেন, সেই ক্লাসিক অফসেট প্রেসে আমরা বহু ছাপার কাজ করছি তখন। তারপর তার সঙ্গে সেখানেই দেখা হয়। অনেক কথা। চা-সিগারেট। রয়েল রেস্তোরায় দুপুরের খাবার। আমি, অনন্ত জাহিদ আর সঙ্গে ছিলেন আলেকান্দা এলাকার ‘বাবু ভাই’ নামে তার কোনো বন্ধু, বরিশালের ছেলে এই ‘বাবু ভাই’ চাকুরী/ব্যবসা সূত্রে তখন ভোলায় আছেন, এমনটাই জানাচ্ছেন। কবিতা-পরিবার-পত্রিকা-বন্ধু এসব নিয়ে অনেক কথা হয়েছিলো সে স্বল্প সময়ে। তিনি জানাচ্ছিলেন তিনি একবার অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গিয়েছিলেন, তার কথামতো, তিনি আর ‘পাগল’ হতে চান না, ‘পাগল’ হওয়াকে তিনি ভয় পান। তার কথায় লক্ষ্য করি মাঝেমধ্যে প্রবল অভিমান।
সারাটা দুপুর সদর রোডে কাটিয়ে বিকেলে ফিরে যাবার আগে ‘আবার দেখা হবে’ বলে এমন অদ্ভুত কমনীয় ভঙ্গিতে চোখ টিপ মারলেন যে আমি আজও তা ভুলতে পারি না। শুধু ভাবি : কবির এ কেমন ঠাট্টা আমি জানি না! ভোলায় ফিরেও ফোন দিয়েছিলেন। তখন জানিয়েছিলাম, তার কাব্যনাটক ‘নয়ারচরের জীবনপুরাণ’ রাজশাহীর ‘চিহ্ন’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন কপি পাঠাতে। সে পাণ্ডুলিপি ছাপা হয়েছে গত মাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে। অথচ সে পত্রিকা আমার হাতে আসতে সে বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ লেগে যায়। এর মাঝে ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ রাতে খবর পেলাম অনন্ত জাহিদ মারা গেছেন। এ খবরটি ফোনে জানান আমাকে অভিজিৎ দাস। তখন আমরা কেউ ভালো নেই, কেননা এর আগে কবি সুমন প্রবাহন আত্মহত্যা করেছেন, তার পর-পর অনন্ত জাহিদের স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ আমাদেরকে কতোখানি বিপন্ন করে তুলেছিলো, নিজের প্রতি অবিশ্বাসী করে তুলেছিলো তা শুধু আমরাই জানি। সেসব জ্বরাগ্রস্ত দিন, মৃত্যুর মিছিল, আত্মপীড়নের রাত্রি আমরাও পেরিয়ে এসেছি এভাবে।
কিন্তু তার হাতে আমার তুলে দেয়া হলো না সেই ‘চিহ্ন’ পত্রিকাটি, যে পত্রিকায় তার কাব্যনাটক ‘নয়ারচরের জীবনপুরাণ’ ছাপা হয়েছিলো। তার স্বেচ্ছামৃত্যুর দু’এক দিন পর উক্ত পত্রিকার সম্পাদক কর্তৃক প্রেরিত ও সাইনপেনে লিখিত পত্রিকার ‘লেখক কপি-অনন্ত জাহিদ’ হাতে পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যাই।
তখন সবে অনন্ত জাহিদ মারা গেছেন। স্তব্ধতায় দিন কাটছে। খুব খারাপ দিনগুলো ছিলো সেসব। মাথার ভেতর সারাক্ষণ কেবলি বাজতো তার কবিতার বই ‘আমি কি তোমার কাছে যেতে পারি’র কবিতা
‘আর কতো দূর…
ব্যস্ত রাস্তা, আবজর্না, পৌরনর্দমা, কাঁচ ও কংক্রিট পেরিয়ে
আমরা কি যেতে পারি প্রিয়তম মানুষের কাছে?
ধর্মের তর্জনী, রাষ্ট্রের ব্যারিকেড, সমাজের কৃত্রিম বিধান
হিংস্র একনায়কের চ্যালা-চামুণ্ডার মতো শাসন করছে প্রতিদিন।
আমাদের অভিযান বারবার ব্যর্থ হয় বিদেশী অর্থের প্রলোভনে;
আমাদের স্বপ্নগুলো কিনে নেয় কালোটাকার অদৃশ্য মালিকেরা;
আমাদের বাসনা পায়ে ঘুঙুর পরানো
একটু নির্জনে, সুন্দরের কাছে, পালাতেও পারি না কখনো :
টুং টাং বেজে ওঠে অসভ্য ঘুঙুর।
* * * *** ***
এসব কুৎসিত দৃশ্য পেছনে ছড়িয়ে আমি কি তোমার কাছে যেতে পারি’
লেখক: কবি ও ছোটকাগজ আন্দোলন কর্মী
|