শিক্ষা সচেতনতার অভাবঃ উপকূলীয় দশমিনায় বাড়ছে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা
 দশমিনায় বাড়ছে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা
কামরুল সোহাগ, দশমিনা :: প্রতি বছর প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষনা করা হয়। কিন্তু ওইসব প্রতিশ্রুতি আর আলোর মুখ দেখে না। শিক্ষা সচেতনতা না থাকায় উপকূলীয় পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। প্রতিবন্ধীরা অযত্নে অবহেলায় অতি কষ্টে জীবন যাপন করছেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ সকল নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এসব প্রতিবন্ধীরা। সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধীর সাথে কথা বলে এ প্রতিবেদনটি তৈরী করছেন আমাদের দশমিনা প্রতিনিধি কামরুল সোহাগ।
উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত ভোলানাথ বেপারীর বিধবা স্ত্রী শৈলবালা। শৈলবালা জানান, তার দুই প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছেন। বড় মেয়ে রিতা(৩৫) জন্ম হয় পঙ্গু অবস্থায়। গ্রামে কত মেয়ের বিয়ে হয় কিন্তু তার এ মেয়ের জন্য এখনো কোন প্রস্তাব আসেনি। দু’হাতের উপর ভর করে ৩৫টি বছর অতিক্রম করে কুমারী রিতা। রিতার পড়ে জন্ম ভবেশের (৩১)। শারীরিক ত্রুটি নিয়ে পৃথিবেীতে আসে ভবেশ। ছেলে মেয়েদের সাথে স্কুলে যায়। ভবেশ দশমিনা মাধ্যামিক বিদ্যালয়েরর ১০ শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করে। কিন্তু ১০ম শ্রেনীতে পড়ার সময় ভবেশ একেবারে পঙ্গু হয়ে যায়। পঙ্গু দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে শৈল বালা শত কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছে।
উপজেলার নিজাবাদ গ্রামের নজির মৃধার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে রেশমা (১৯)। দুই বছর বয়সে কালা জ্বরে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার অভাবে চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যায় তার। বর্তমানে ৩ ভাই আর মা-বাবার সংসারে রেশমা এখন পরিবারের বোঝা। চোখ না থাকায় বিয়ে হয়নি, দুবেলা খেতে গেলে বিভিন্ন কথার শুনতে হয় পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে।
অপর প্রতিবন্ধী সাজু বিবি। চার দশক আগে বিয়ে হয় সাজু তার। দু’মাস না যেতেই শরীরে দেখা দেয় গুটি বসন্ত। ভয়ে কেউ তার কাছে ঘেঁষেনা। অযত্ন অবহেলায় তার ব্যাধি সেরে উঠে। কিন্তু জীবনের তরে চোখ দুটো হারাতে হয়। সুন্দর পৃথিবী এখন শুধুই অন্ধকার।
উপজেলার বেতাগী সানকিপুর ইউনিয়নের পঙ্গু আঃ জব্বার (৫৫)। প্রতিদিন জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভিক্ষা বৃত্তির জন্য টায়ারে ভর দিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে ভিৰা করতে আসেন। হাতে ভিক্ষার থালা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আ. জব্বার। পা দু’টো শরীরের তুলনা চিকন। অজানা কারনে শিশু বয়স থেকে পঙ্গুত্ব নিয়ে ঘুরছে আ. জব্বার।
লুৎফা বেগম (২৫) জন্মগত শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। মায়ের আচলের নিচে বেঁচে আছে লুৎফা। তার মা বলেন, মাইয়া টা মইর্রা গ্যালে বাইচ্চা যাইতাম। এহন আর পারছি না। এ উপজেলায় শুধু রেশমা, ঝন্টু, সাজু, আঃ জব্বার, রিতা, ভবেশ আর লুৎফাই নয় এদের মতো আরও ৬ সহস্রাধিক প্রতিবন্ধী রয়েছে দশমিনায় বলে স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দাবি করেন। এদের কপালে জুটেনি কোন প্রতিবন্ধী ভাতা। পরিবার পরিজন পারছে না এদের সঠিক পরিচর্যা করতে। সরকারিভাবে উদ্যোগ থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
উপজেলা সমাজ সেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে ৬ হাজারেরও অধিক প্রতিবন্ধী রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের মধ্যে ২ শ’ জন সুদ মুক্ত ঋণ ও ২ শ’ জন ভাতা সুবিধা পাচ্ছেন। আরও ৬৫ জন প্রতিবন্ধী ভাতা সুবিধারয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। স্বাস্থ্য জরিপ মতে, উপজেলার ছয় ইউনিয়নে মোট লোক সংখ্যা ১লক্ষ ৪৩হাজার ২৩৪ জন। যার মধ্যে শতকরা ৪ দশমিক ১৯ ভাগ প্রতিবন্ধী। এসব প্রতিবন্ধীর মধ্যে মাত্র শতকরা ৬ দশমিক ৬৭ ভাগ সরকারী সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। অবশিষ্টরা সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত।
উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার আঃ রশিদ খান জানান, শিক্ষা সচেতনতার অভাবে দশমিনায় প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আবুল খাইর জানান, জন্ম নিরোধক বড়ি অনিয়মিত সেবনের ফলে প্রতিবন্ধী বাচ্চা জন্ম হয়। এজন্য জন্ম নিরোধক বড়ি নিয়মিত সেবনের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
–
(আমাদের বরিশাল ডটকম/দশমিনা/কাসো/তাপা)
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |