লিফট ছাড়াই চালু হতে যাচ্ছে পিরোজপুর ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে হাসপাতালের চারটি ফ্লোরে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হাসপাতালটি চালু হলে জেলা ও এর আশেপাশে বিভিন্ন এলাকার লাখো মানুষ আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসাসেবার সুযোগ পাবে। এতে চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী জেলায় যাওয়ার ভোগান্তিও অনেকটাই কমবে বলে আশা স্থানীয়দের।
১৯৮৪ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে পিরোজপুর সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় ৫০ শয্যার নতুন ভবন। ২০০৫ সালে সেটি ১০০ শয্যার হাসপাতালে রুপান্তর হয়। ২০১৭ সালে পিরোজপুরবাসীর জন্য ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়। শুরুতে ৭ তলা হিসেবে পরিকল্পিত হলেও পরে ৯ তলায় উন্নীত হয়।
করোনা মহামারির কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণ সম্পন্ন হয়। প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি এখনো লিফট ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় উদ্ভোধন হয়নি।
দিনে দিনে আসন এবং ভবনের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি চিকিৎসা সেবার মান। তাই পিরোজপুরে ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালটিকে ঘিরে মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জন্মেছে। হাসপাতালটি চালু হলে শুধু পিরোজপুর নয়, আশেপাশের প্রায় ২০ লাখ মানুষ আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় চিকিৎসা প্রত্যাশীরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে শোনা যাচ্ছে পিরোজপুরের ২৫০ শয্যা হাসপাতালটি উদ্বোধন হবে কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি সম্ভব হয়নি। যার কারণে জেলার মানুষ উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলায় উন্নত চিকিৎসা সেবা না থাকায় সামান্য কিছু হলেই বরিশাল অথবা খুলনায় স্থানান্তর করা হয়। ফলে একদিকে যেমন ভোগান্তি অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে চিকিৎসা প্রত্যাশীদের। অতি দ্রুত হাসপাতালটির উদ্বোধন করে পিরোজপুর জেলার মানুষের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক।
পিরোজপুর সদর হাসপাতালে স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে এসেছেন কায়সার আহমেদ। তিনি বলেন, পিরোজপুরে অনেক বছর ধরে ২৫০ বেড হাসপাতালের কাজ চলতেছে কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই কাজ শেষ হয় নাই এবং জনগণের দুর্ভোগ কমে নাই। প্রায় ৬-৭ বছর হয়ে যাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত এই হাসপাতালটি উদ্বোধন হয় নাই।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালটি উদ্বোধন না হওয়ার কারণে বর্তমান জেলা হাসপাতালে রোগীরা ঠিকমতো সিট পায় না। হাঁটার জায়গায় রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, এর থেকে খারাপ আর কি হতে পারে। যদি ২৫০ বেড হাসপাতালটি চালু হতো তাহলে এখানে অভিজ্ঞ ডাক্তার থাকত, পর্যাপ্ত বেড থাকত, জনগণের দুর্ভোগ কমত এবং ভালো চিকিৎসা পেত। আমরা চাই অতি দ্রুত এই হাসপাতালটি চালু হোক।
সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন রফিকুল ইসলাম তিনি বলেন, এটি ১০০ শয্যা হাসপাতাল কিন্তু রোগী আছে আড়াইশো এর বেশি। এই হাসপাতালের প্রধান সমস্যা, রোগীর চাপ এতই বেশি থাকে যে, হাঁটার জায়গায়ও থাকে না। অনেক সময় একটা বেডে দুই জন করেও রোগী থাকে। তাতে রোগীরা সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যায়। এত রোগী থাকার কারণে রোগীদের চিকিৎসা দিতে ডাক্তার ও নার্সরা হিমশিম খেয়ে যায়। যদি আমাদের নতুন হাসপাতাল টা চালু হতো তাইলে আমরা এই সব সমস্যার সমাধান পেতাম।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পিরোজপুরে তেমন কোন চিকিৎসা সেবা না থাকায় হয় খুলনা না হলে বরিশাল যেতে হয় বাধ্য হয়ে। বিকল্প কোন পথ থাকে না আমাদের। যদি এই হাসপাতাল টা চালু হতো তাহলে আমরা এ ধরনের ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পেতাম। আমরা পিরোজপুরবাসী চাই যত দ্রুত সম্ভব এই হাসপাতালটি চালু করা হোক এবং এটি চালু হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে।
চিকিৎসা প্রত্যাশী মোস্তফা হাওলাদার বলেন, পিরোজপুরের আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এই হাসপাতালে অনেক রোগী আসে। এখানে আসার পরে রোগীদের যে সেবাটা পাওয়া দরকার তারা সেটা পাচ্ছে না। এখানে একটি নতুন ভবন হচ্ছে কিন্তু সেটা এখনো চালু হয় নাই। যার কারনে রোগীরা ডাক্তারের সেবা খুব বেশি একটা পাচ্ছে না। যদি আড়াইশো বেড হাসপাতালটি চালু হয় তাহলে সেবার মান বাড়বে।
স্থানীয় চিকিৎসা প্রত্যাশী মাসুদ শেখ বলেন, এই হাসপাতালে ডাক্তারের থেকে বেশি সমস্যা সিটের। সামান্য কিছু হলেই খুলনা অথবা বরিশাল পাঠিয়ে দেয়। এখানে ভালো কোন চিকিৎসা হয় না। আমাদের পিরোজপুরবাসীর চাওয়া দ্রুত এই হসপিটালটি চালু হোক। এখানে আমরা সাধারণ রোগীরা আসি, জায়গা স্বল্পতার কারণে আমাদের অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বড় হাসপাতালটি চালু হলে পর্যাপ্ত বেড পাওয়া যাবে, খোলামেলা জায়গা পাওয়া যাবে। গেদারিং হবে না, ভোগান্তি হবে না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে। আমরা চাই আড়াইশো বেড হাসপাতাল দ্রুত চালু হোক।
পিরোজপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, সিভিল সার্জন মহোদয়ের চাহিদাক্রমে চারতলা পর্যন্ত চাইলেই বুঝিয়ে দিতে পারি কিন্তু আমাদের বিদ্যুৎ কানেকশন নেই এবং ফার্নিচার ঢাকা থেকে আসবে। বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে কথা বলা হয়েছে। এ মাসের মধ্যেই চারতলা পর্যন্ত সিভিল সার্জন মহোদয়ের কাছে বুঝিয়ে দেব। আমাদের ড্রয়িং ডিজাইন সহ লিফট তৈরি হচ্ছে, আশা করি অক্টোবর মাসের ভেতরে দেশে আসবে। আসলে লিফট ইনস্টলেশন করিয়ে দেব।
পিরোজপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের কার্যক্রম প্রায় ৯৮ ভাগ কাজ কমপ্লিট হয়েছে। বাকি যে ২ পার্সেন্ট কাজ বাকি আছে, আশা করি আগামী ৩০ শে জুনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে সক্ষম হব।
তিনি আরও বলেন, এখানে দুটো জিনিস বাকি আছে বৈদ্যুতিক সংযোগ এটির ব্যাপারে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছি। আমরা গণপূর্ত বিভাগের সাথে সমন্বয় করে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি ৩০ শে জুনের মধ্যে ফার্নিচার চলে আসবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ফার্নিচার, বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হবে। এছাড়াও লিফট আগামী দুই তিন মাসের মধ্যে চলে আসবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রথমে এক থেকে চারতলা পর্যন্ত হ্যান্ডওভার নিব। আগামী ৩০শে জুনের মধ্যে আমাদের সেবার পরিধি বাড়াব। লিফট আসার পরে ৯ তলা পর্যন্ত আমরা কার্যক্রম শুরু করব। আমরা পিরোজপুর জেলাবাসীকে কাঙ্খিত স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাব।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহমদ সোহেল মনজুর সুমন বলেন, আমরা বিষয়টাকে অনেক গুরুত্ব সহকারে দেখছি। আমরা চাচ্ছি লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে প্রাথমিকভাবে ৩ টা ফ্লোরে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য। লিফট আগস্ট মাসে হয়ত চলে আসবে। আমরা লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে স্বাস্থ্য সেবা শুরু করব। এই হাসপাতালটি চালু হলে পিরোজপুরবাসীর দুর্ভোগ কমবে এবং উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে।
শীঘ্রই হাসপাতালটি চালু হলে জেলার লাখো মানুষ পাবে আধুনিক চিকিৎসা সেবার সুযোগ। এমন প্রত্যাশাই এখন পিরোজপুরবাসীর।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
পুলিশের ধাওয়ায় ড্রেনে পড়ে আ.লীগ নেতার মৃত্যু, স্বজনদের অভিযোগ
বরিশালে কিশোর গ্যাংয়ের সশস্ত্র শোডাউন
বরিশালে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন
ভাঙ্গা-কুয়াকাটা রেললাইন প্রকল্প:লাল কালির নম্বরেই বছরের পর বছর পার