বরিশালের চার আসন: আ.লীগের ভোটের আশায় জুলাই বিপ্লবের নেতারা
বিশেষ প্রতিনিধি:
কেবল বিএনপি আর জামায়াতে ইসলামী নয়, আওয়ামী লীগের ভোট পেতে মরিয়া জুলাই বিপ্লবের নেতারাও। তাই তো এখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের গ্রেফতার বা হেনস্তা না করার দাবি তাদের। প্রকাশ্য জনসভা, গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-এমনকি ফেসবুক লাইভেও করা হচ্ছে এই দাবি। বরিশাল অঞ্চলে ভোটের মাঠে থাকা জুলাই বিপ্লবের তিন শীর্ষ নেতা করছেন এমনটা। ৪টি নির্বাচনি এলাকায় প্রার্থী হিসাবে লড়ছেন তারা। তাদের একজন আছেন বিএনপি সমর্থিত সমমনা জোটে। বাকি দুজনের একজন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট এবং অপরজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা। জুলাই বিপ্লবে এই ৩ জনেরই ছিল সক্রিয় ভূমিকা, ছিলেন নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে।
বর্তমান সময়ে আলোচিত ডাকসুর সাবেক ভিপি গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সমমনা দল হিসাবে বিএনপির ছাড় দেওয়া পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা-গলাচিপা) আসনে ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করছেন তিনি। এখানে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। জুলাই বিপ্লবে নুরের ভূমিকা কী ছিল, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ১/২ মাস আগেও ফ্যাসিস্ট দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন তিনি। দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতেও ছিল তার সমর্থন। ফ্যাসিস্টের সহযোগী আখ্যা দিয়ে আন্দোলন করেছেন জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের। আগাগোড়া আওয়ামীবিদ্বেষ দেখানো এই নেতা এখন বলছেন আওয়ামী লীগের পক্ষে। প্রকাশ্য জনসভায় দাবি তুলছেন দলটির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার না করার। ২২ জানুয়ারি নির্বাচনি এলাকার এক জনসভায় দেওয়া বক্তৃতায় নৌকার সাধারণ ভোটাররা তাকে ভোট দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন নুর। নৌকার পাশাপাশি ধানের শীষের ভোটাররাও তাকে ভোট দেবেন, বলেন তিনি।
বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনের প্রার্থী হিসাবে ধানের শীষের ভোট পাওয়ার কথা বললেও আওয়ামী লীগের ভোটাররা কেন তাকে ভোট দেবেন জানতে চাইলে নুর বলেন, ‘এই আসনটি আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত। ৯০-পরবর্তী সময়ে এখানে কখনোই হারেনি নৌকা। এখন যেহেতু নৌকা নেই, তাই নৌকার ভোটাররা আমাকে ভোট দেবে। কারণ, নির্বাচনি এলাকায় তাদের সঙ্গে কখনো খারাপ আচরণ করিনি। আওয়ামী লীগের সবার সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে।’ জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী মামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও কারাবাস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে গ্রেফতার করাইনি। গণহারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের পক্ষেও নই। সব সময় চেষ্টা করেছি নিরপরাধদের রক্ষা করতে। এখনো দাবি জানাচ্ছি সুষ্ঠু তদন্ত আর দোষী ছাড়া আওয়ামী লীগের কাউকে গ্রেফতার না করার।’
জুলাই আন্দোলনের আরেক নেতা আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে দলের হয়ে ঈগল প্রতীকে ভোট করছেন তিনি। ইসলামী ও সমমনা ১০ দলীয় জোটের অংশীদার হিসাবে এরই মধ্যে তাকে সমর্থন দিয়েছে জামায়াতসহ বাকি ৮টি রাজনৈতিক দল। তার পক্ষে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির নেতা ব্যারিস্টার ফুয়াদও এখন কৌশলে চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা। কয়েকদিন আগে ফেসবুক লাইভে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে হওয়া মামলায় গণহারে গ্রেফতারের নিন্দা জানান তিনি। ওই মামলাগুলোকে গায়েবি আখ্যা দিয়ে নিরীহ ও সাধারণ কাউকে যেন গ্রেফতার করা না হয়, তুলেছেন সেই দাবি। তেমনটা হলে দায়ী সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অভিযোগ জানানোরও হুঁশিয়ারি দেন ফুয়াদ।
বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য-সচিব ওয়াহিদুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, ‘গায়েবি কিংবা মিথ্যা, যাই হোক না কেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী এসব মামলা নিয়ে এই প্রথম সোচ্চার হয়েছেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ। এটা যদি মামলা হওয়ার পরপরই বলতেন, তাহলে বুঝতাম যে সত্যিকার অর্থেই নিরীহ নিরপরাধদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন তিনি। ফেসবুক লাইভে সরাসরি না বললেও এটা পরিষ্কার যে কাদের মামলা কিংবা গ্রেফতার থেকে বাঁচানোর চেষ্টা তার। মূলত আওয়ামী লীগের ভোট পেতেই এসব বলছেন তিনি।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘নিরীহ-নিরপরাধদের মামলার ফাঁদে ফেলে হয়রানি না করার কথা আমি শুরু থেকেই বলছি। যারা আমার পক্ষে কাজ করছে, আমাকে ভোট দেবে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষকে গায়েবি ও মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে। আমি চাই তদন্তে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ যেন কাউকে গ্রেফতার না করে। অজ্ঞাতনামা আসামির নামে যেন কোনো গ্রেফতার বাণিজ্য না হয়।’ জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, বলেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে রাজপথে থাকা ইসলামী আন্দোলনের নেতারাও চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের ভোট পাওয়ার চেষ্টা। দলের খোদ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের একাধিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে বিষয়টি। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্য ভাঙার আগ পর্যন্ত অবশ্য এ বিষয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য ছিল না দলটির। তবে ঐক্য ভাঙার পর থেকেই যেন নৌকার ভোট পেতে মরিয়া তারা। বরিশাল-৫ (সদর) এবং বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে নির্বাচন করছেন মুফতি ফয়জুল। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়াই কেবল নয়, দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে তাদের পাশে ছিলেন তিনি। রাজধানীতে সেসময় অংশ নিয়েছেন আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে। সেই ফয়জুলই বর্তমানে তার নির্বাচনি এলাকার দুটি আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে দাবি জানিয়েছেন সরকারের প্রতি। অবশ্য এক্ষেত্রে ‘যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ওয়ারেন্ট নেই’ বাক্যটি জুড়ে দিচ্ছেন তিনি।
২২ জানুয়ারি বরিশাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ফয়জুল করিম বলেন, ‘দল হিসাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে; কিন্তু এই দলের যারা সাধারণ ভোটার, তাদের নাগরিকত্ব তো আর বাতিল হয়নি। দেশের নাগরিক হিসাবে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’ নৌকার ভোটারদের পক্ষে সোচ্চার হওয়াই কেবল নয়, আওয়ামী লীগ কর্মীদের গ্রেফতারেরও বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা। এক প্রশ্নের জবাবে মুফতি ফয়জুল করীম বলেন, ‘নির্বাচনে ভয়ভীতিহীন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মী কেবল নয়, কোনো দলের কাউকেই গ্রেফতার করা ঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে সাধারণ ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। কেবল যাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে, তাদেরই গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ। অন্যথায় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশাল স্কাউটের অনিয়ম নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে: শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান
বরিশালে মারজুকের মামলা বাণিজ্যে হয়রান মানুষ
১৩ জুলাই বরিশালে আসছেন তারেক রহমান, গৌরনদীতে সেনা ক্যাম্প পরিদর্শন ও সাংগঠনিক সভা
দক্ষিণাঞ্চলে বেহাল ১১ শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক, কোনোটাতে বাস করে সাপ