Current Bangladesh Time
Friday May ৮, ২০২৬ ৮:৫০ AM
Barisal News
Latest News
Home » বরিশাল » বানারীপাড়া » নিভে না আগুন! (সেঁতারা’র ট্রাজেডি)
৬ April ২০২৬ Monday ১২:৪৪:২৬ PM
Print this E-mail this

নিভে না আগুন! (সেঁতারা’র ট্রাজেডি)


মোঃ কাওসার হোসেন, (শিক্ষক ও সাংবাদিক):

বরিশালের বানারীপাড়ার খালপাড়ে সন্ধ্যা নামলে আজও বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য কান্নায়। কেউ শোনে না, তবুও সেই কান্না থেমে থাকে না। নিঃশব্দে ভেসে আসে একটি নাম—সেঁতারা বেগম।

মানুষ তাকে চিনত “সেঁতারা পাগলি” নামে।

কিন্তু কেউ কি জানত, এই নামের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক দগ্ধ জীবনের দীর্ঘ আর্তনাদ?

প্রায় চার দশক আগে, পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের খালপাড়ে,আঃ রহিম স্যারের বাড়ির কাছারিঘরের দক্ষিণ পাশে একটি ছোট কাঠের ঘরে স্বামী-সন্তান নিয়ে ছিল তার স্বপ্নের সংসার। স্বামী আব্দুল হক মিয়া গ্রামে গ্রামে আইসক্রিম বিক্রি করতেন। দিনগুলো কেটে যেত হাসি, ভালোবাসা আর ছোট ছোট সুখে।

সেঁতারা তখন পাগলি ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন পূর্ণ মানুষ, একজন মা, একজন স্ত্রী।

তারপর এক দুপুরে আগুন এলো।

হঠাৎ করেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল সেই ছোট্ট কাঠের ঘর। আগুন শুধু কাঠের দেয়াল পুড়ায়নি—পুড়িয়ে দিয়েছিল তার নিশ্চিন্ত জীবন, তার স্বপ্ন, তার ভরসা। আগুন নিভে গিয়েছিল, কিন্তু তার ভেতরের আগুন আর কোনোদিন নিভেনি।

এরপর তারা পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের তমালতলায় একটি ভাড়াটিয়া বাসায় আশ্রয় নিল। আবার নতুন করে সংসার শুরু হলো। বড় মেয়ে পারুল, তার পর শিউলি, আর সবার ছোট সেই ছেলেটি—যে ছিল সেঁতারার বুকের ভেতরকার আলো। নাড়ী ছেড়া ধন।

কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি যেন তার জন্য আরও গভীর অন্ধকার জমিয়ে রেখেছিল।

স্বামী স্ত্রীর অমতে দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। একই ছাদের নিচে শুরু হলো অদৃশ্য দহন। তবুও মা হয়ে তিনি আঁকড়ে ছিলেন তার সন্তানদের।

একদিন সেই ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে খালের ঘাটে যাওয়া হলো।

সেই দিনটাই ছিল তার জীবনের শেষ আলো দেখার দিন।

স্রোতের জলে হারিয়ে গেল তার একমাত্র ছেলেটি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দূরে কোথাও ভেসে উঠল নিথর দেহ। চারদিকে ফিসফাস—এক ভয়ংকর অভিযোগ উঠল সতীনের বিরুদ্ধে।

কিন্তু এক মায়ের হৃদয় শুধু জানত—সে তার সন্তানকে হারিয়েছে। এই হারানো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

সেদিন থেকেই সেঁতারা ভেঙে পড়েননি—তিনি ভেঙে গিয়েছিলেন।

কান্না তাকে গ্রাস করল, শোক তাকে গ্রাস করল, আর ধীরে ধীরে তিনি নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। নিজের সাথে নিজেই কথা বলতেন—যেন শব্দের ভেতর হারানো ছেলেটিকে খুঁজে ফিরছেন।

মানুষ তখন তাকে নাম দিল—“পাগলি”।

কিন্তু এই পাগলামির জন্ম দিয়েছিল কে?

তিনি ঘুরে বেড়াতেন বানারীপাড়ার অলি-গলিতে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন, কিন্তু কখনো কিছু চাইতেন না। কেউ কিছু দিলে সেটাই ছিল তার আহার, না দিলে ক্ষুধাকেই সঙ্গী করতেন।

আরও নির্মম ছিল মানুষের আচরণ।

শিশুরা তার এলোমেলো চেহারা দেখে ভয় পেত, কেউ কেউ তাকে দেখে ঢিল ছুঁড়ত, হাসাহাসি করত।

একজন মায়ের ভাঙা জীবনের প্রতি এই নিষ্ঠুরতাও যেন সমাজের আরেকটি মুখ উন্মোচন করত।

রাত হলে তার আশ্রয় ছিল আরও নিঃসঙ্গ।

ডাকবাংলোর পাশে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত ভবনের সামনে তিনি রাত কাটাতেন। সেখানে  আব্দুল মান্নান স্যারের ভেড়া আর ছাগলের পাশে বসে থাকতেন—যেন মানুষ তাকে ত্যাগ করেছে, আর তিনি আশ্রয় নিয়েছেন নির্বাক প্রাণীদের কাছে।

এই শহরের ভিড়ের মাঝেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা।

তবুও কিছু আলো ছিল। পৌরসভার

সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ডেইজি বেগম তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, নিজের হাতে মায়ের মত পরম যত্ন করেছেন। পরে তাকে একটি সরকারি ঘরও করে দেন। এক পর্যায়

স্বামীও ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, নতুন কাপড় দিয়েছেন—কিন্তু সেঁতারা আর ফেরেননি।

হয়তো অভিমান, হয়তো ভাঙা মন—রাস্তাই হয়ে উঠেছিল তার একমাত্র ঠিকানা।

সময় বয়ে গেছে।

মানুষ ভুলে গেছে।

শুধু মাঝে মাঝে কেউ আঙুল তুলে বলেছে—“ওই যে সেঁতারা পাগলি…”

শেষ পর্যন্ত, শুক্রবার সন্ধ্যায়, তিনি চুপচাপ চিরঘুমে চলে গেলেন।

কোনো অভিযোগ না রেখে, কোনো দাবি না জানিয়ে—নীরবে-নিভৃতে নিঃশব্দে……

 জানাজা শেষে তাকে চির নিন্দ্রায় শায়িত করা হল। 

মাটি তাকে বুকে নিল।

মানুষ কিছুক্ষণ চোখ মুছলো, তারপর আবার সব ভুলে যাবে।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যাবে—

আমরা কি তাকে বাঁচাতে পেরেছিলাম?

সেঁতারা পাগলি ছিলেন না।

তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত ইতিহাস, এক মায়ের অন্তহীন শোক, এক সমাজের নীরব ব্যর্থতা।

তার জীবনের আগুন নিভেনি—

শুধু ছাই হয়ে আমাদের বিবেকের উপর পড়ে আছে।

অনুলিখন; 

রাহাদ সুমন

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
দুই মাসে ডজনের বেশি প্রকাশ্য কর্মসূচি: বরিশালে দাপট দেখাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে নানান অব্যবস্থাপনা, নারী দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য
তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা,তার ‘স্মৃতিশক্তি নেই’, আদালতকে জানালেন আইনজীবী
বরিশাল মহানগর পুলিশের নতুন কমিশনার আশিক সাঈদ
বরিশালে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে শিপইয়ার্ড: একই পথে ডকইয়ার্ডও
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com