উপজেলা সদর থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরের একটি ইউনিয়নের বাসিন্দা আমি। দূরত্ব শুনতে কম মনে হলেও বাস্তবতা যেন কয়েক যুগ পিছিয়ে থাকা এক জনপদের প্রতিচ্ছবি। নাজিরপুর উপজেলার ৩ নং দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়নে বসবাস করে প্রতিদিন আমি উপলব্ধি করি—উন্নয়নের মানচিত্রে আমাদের অবস্থান কতটা অনিশ্চিত, কতটা উপেক্ষিত।
আমাদের এখানে রাস্তা বলতে কাদা-মাখা সরু মেঠোপথ, যা বর্ষা এলেই সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়। চারপাশের ছোট-বড় অসংখ্য খালই হয়ে উঠেছে প্রকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই খালগুলোর বুক চিরে চলা নৌকাই আমাদের একমাত্র ভরসা—একই সঙ্গে বাহন, পথ এবং জীবনরেখা।
এই জনপদে সকালে ঘুম ভাঙে অন্য রকম বাস্তবতা নিয়ে। দেশের অন্য প্রান্তে যেখানে শিশুরা হেঁটে বা যানবাহনে করে স্কুলে যায়, সেখানে আমাদের শিশুরা বৈঠা হাতে নৌকায় ওঠে। তাদের ছোট ছোট হাতেই থাকে জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে শিক্ষার পথে যাত্রা।
নদীর ঢেউ, খালের স্রোত, কচুরিপানার বিশাল স্তূপ—সবকিছুকে জয় করে তাদের স্কুলে পৌঁছাতে হয়। অনেক সময় মাঝপথে নৌকা থেমে যায়, কখনো বই-খাতা ভিজে যায়, আবার কখনো ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কা মাথায় নিয়ে তারা এগিয়ে চলে। এটি কোনো গল্প নয়—এটাই আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
শীতকাল এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কচুরিপানায় খাল পুরোপুরি আটকে যায়, নৌকা চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। তখন অনেক শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলে যাওয়া স্বপ্নের মতো হয়ে যায়। শিক্ষা তখন আর অধিকার থাকে না—একটি কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়।
পানি কিছুটা কমলে মেঠোপথ দেখা যায়, কিন্তু সেটাও স্বস্তির নয়। বাঁশের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো, কাদামাখা সরু পথ—প্রতিটি পদক্ষেপ যেন জীবন হাতে নিয়ে হাঁটার মতো। ছোট একটি ভুলেই ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আমাদের ইউনিয়নে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও সেখানে পৌঁছানোর নিরাপদ কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক—সবাই একই দুর্ভোগের শিকার। অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে মাঝপথেই ঝরে পড়ছে।
এই বাস্তবতার ভেতর দিয়েই আমাদের শিক্ষার্থীরা বড় হয়। যারা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যায়, তারাই জানে এই পথ কতটা কঠিন, কতটা নিষ্ঠুর। তারা আসলে একটি “নীরব যুদ্ধ” লড়েই নিজেদের গড়ে তোলে। আমি নিজেও সেই সংগ্রামী দলের একজন সাক্ষী।
আমার নিজের জীবনে এমন বহু ঘটনা আছে, যা আজও মনে পড়লে ভারী হয়ে ওঠে বুক। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কচুরিপানায় ছোট খাল আটকে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। ক্ষুধার যন্ত্রণা নিয়ে অন্ধকার নামার পর বাড়ি ফিরেছি বহুবার। আবার কলেজ ছুটির পরে রাত ৭টা–৮টা বেজে যেত, কারণ নদীতে নৌকা বা লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকত কচুরিপানার কারণে। চারপাশ থমকে যেত, শুধু আমাদের অপেক্ষা চলত—প্রকৃতির নিয়মের কাছে অসহায় মানুষের মতো।
এই অঞ্চলের মানুষের জীবন নৌকার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, বাজার করা, চিকিৎসা নেওয়া, এমনকি জরুরি কোনো কাজ—সবকিছুর জন্যই পানিপথে নির্ভর করতে হয়। এক প্রবীণ মানুষের কথায়, “আমাদের জীবন একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।” এই কথাটি শুধু অনুভূতি নয়—এটি আমাদের অস্তিত্বের নির্মম সত্য।
দেশ আজ উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে—মহাসড়ক, সেতু, মেট্রোরেল, বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়নের আলো কি সত্যিই আমাদের মতো প্রত্যন্ত জনপদে পৌঁছাচ্ছে? নাকি আমরা এখনো সেই পুরোনো অন্ধকারেই পড়ে আছি?
একজন সচেতন নাগরিক ও এই জনপদের ভুক্তভোগী হিসেবে কিছু প্রশ্ন না করে পারি না— গ্রামের মানুষ কি আজীবন নৌকাকেই একমাত্র যানবাহন হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য থাকবে? শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব নয়? উন্নয়ন কি কেবল শহরের অলংকার হয়ে থাকবে, নাকি গ্রামবাংলার বিল-খালেও পৌঁছাবে?
একটি পাকা রাস্তা আমাদের কাছে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি হতে পারে শিক্ষার আলোকবর্তিকা, উন্নয়নের দরজা, আর একটি প্রজন্মের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
এই জনপদের মানুষ বছরের পর বছর শুধু অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষা কখন শেষ হবে—এই প্রশ্ন আজ আর শুধু প্রশ্ন নয়, এটি এক নীরব আর্তনাদ।
এই আর্তনাদ কি কেউ শুনবে?
লেখক পরিচিতি
মাসুদ রানা আকন
বি.এ (অনার্স), এম.এ (মাস্টার্স)
একজন উদীয়মান লেখক। তিনি কবিতা ও সমাজ, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
দুই মাসে ডজনের বেশি প্রকাশ্য কর্মসূচি: বরিশালে দাপট দেখাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে নানান অব্যবস্থাপনা, নারী দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য
তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা,তার ‘স্মৃতিশক্তি নেই’, আদালতকে জানালেন আইনজীবী
বরিশাল মহানগর পুলিশের নতুন কমিশনার আশিক সাঈদ
বরিশালে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে শিপইয়ার্ড: একই পথে ডকইয়ার্ডও