`ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল’- বহুল প্রচলিত প্রবচনের বরিশাল তার সেই পরিচয় থেকে বহু দূর চলে গেছে অনেক আগেই। একই সময় গায়েব হয়ে গেছে নগরীর অনেক পুকুর।
নগরীর পুকুর মানেই যেন গনিমতের মাল। চলমান এই তাণ্ডবের ধারায় ইউনুস সরকারের সময় নগরীর ব্রাউনকম্পাউন্ডের দীঘিসম একটি পুকুর বেশ আলোচনায় আসে। এর কারণ, এটি ভরাটের অভিযোগ ওঠে বিএনপির নেত্রী বিলকিস জাহান শিরিনের বিরুদ্ধে। যদিও এ অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে আসছেন। তবে তিনি এই পুকুরের মালিকানা দাবি করছেন জোর গলায়। তার ভাষায়- এটি তার ‘বাপ-দাদার’ মালিকানার পুকুর।
এই দাবির সঙ্গে যারা একমত নন, তাদের ভাষ্য, ব্রাউন সাহেব বিশাল এই পুকুরটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, কাউকে মালিকানা দেননি।কিন্তু সেই পুকুরটি এখন আর ব্যবহার করার অবস্থায় নেই।বরং এক সময়ের স্বচ্ছ জলের এই পুকুরটি ভরাট করে ফেলায় সেখানে এখন কুকুর ঘুমায়। এবং নির্জন কোনায় বসে মাদকসেবীদের আসর। ভবিষ্যতে হয়তো এটির ওপর মাথা তুলবে সুউচ্চ ভবন।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যের অভিযোগে ইউনূস সরকারের সময় অন্তত ছয় হাজার নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। কারো পদ ও দলীয় কার্যক্রম করা হয়েছে স্থগিত। অপকর্মের অভিযোগে আলোচিত বহিষ্কৃতরা এখন কেমন আছেন? সূত্র বলছে, অনেকেই আছেন ফুরফুরে মেজাজে। কেউ দলে ভিড়েছেন, ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার মতো। কেউ আবার আছেন ফেরার পাইপলাইনে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব আলোচনা বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এসব কিছু ছাপিয়ে বরিশালে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ বিলকিস জাহান শিরিনকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি। কারণ ‘পুকুর কাণ্ডে’ বিএনপি তার পদ ও কার্যক্রম স্থগিত করলেও সরকার তাকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় গত ১৪ মার্চ।
এর আগে যখন বরিশাল নগরীর পুকুর দখলের অভিযোগে তার পদ স্থগিত করেছিল বিএনপি, রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) বিলকিস জাহান শিরিনের দলীয় পদ স্থগিত করা হয়েছে।পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) হিসেবে বিলকিস জাহান শিরিনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।’
দলীয় এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বলা হতো, ‘বিলকিসের রাজনীতি পুকুরে ডুবলো!’ কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তিনি আবার রাজনীতিতে শক্ত ভিত্তি পেয়ে গেছেন। বরিশালের রাজনীতিতে তার অবস্থা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দৃঢ়।
এখন প্রশ্ন হলো, দলীয় পদ এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করা বিলকিস জাহান শিরিনকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলো কেন সদাশয় বিএনপি সরকার? এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে নগরজুড়ে, আছে নানান প্রশ্নও। এদিকে তাকে ঘিরে বরিশাল বিএনপিতে নতুন মেরুকরণ বেশ স্পষ্ট বলে জানা গেছে।
পুকুর দখলের অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন বিলকিস জাহান শিরিন। সঙ্গে এও বলছেন, ‘পুকুরটি আমার বাপ-দাদার সম্পত্তি, এটা ঠিক।’ কিন্তু সূত্র বলছে, পুকুরটি তার বাবারও নয়, দাদারও নয়। তবেব্রাউন কম্পাউন্ডের বনেদি পরিবারের সন্তান বিএনপি ঘনিষ্ঠ এক ধনাঢ্য ঠিকাদারের অর্বাচীন চক্করের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন বিলকিস জাহান। তা না হলে দীর্ঘ রাজনীতির পোড় খাওয়া শিরিনের পক্ষে সংবেদনশীল সময়ে পুকুর দখলের মতো কাঁচা কাজ করার কথা নয়। তিনি তৃণমূল থেকে বেড়ে ওটা প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। নতুন করে এই প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন বিসিসির প্রশাসক হিসেবে তার কার্যালয়ে স্তুতিগাথার ব্যানার নিজ হাতে অপসারণ করে।
এদিকে কেবল পুকুর কাণ্ড নয়, বিলকিস জাহান শিরিনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে একাধিক জাতীয় দৈনিকে। প্রথম আলোতে দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘২৮ অক্টোবর থেকে টানা আড়াই মাসের আন্দোলনে দল থেকে দেওয়া অর্থ তছরুপ, বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি করার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনসহ নানা অভিযোগ আছে বিলকিস জাহানের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে সম্প্রতি মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নিজের লোকদের পদ দেওয়া ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও আছে।’
প্রথম আলোর এই রিপোর্টে বিলকিস জাহানের বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন ‘এত নোংরা এবং কাল্পনিক অভিযোগ করে আমাকে বিতর্কিত করা হয়েছে। এসবে বিন্দুবিসর্গ সত্যতা নেই। প্রতিহিংসাবশত এসব কাল্পনিক অভিযোগ তুলে আমাকে জব্দ করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে।’
রাজনীতিতে বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের হাতেখড়ি ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের মাধ্যমে। ১৯৮৭ সালে তিনি বিএম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক হন।পরে ১৯৯০ সালে নির্বাচিত হন এজিএস। ১৯৯১ সালে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হন। বরিশাল জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হন ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি।
প্রচার আছে, সংরক্ষিত আসনে এমপি হবার সময় বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের জন্য বরিশাল বিএনপির যে নেতা তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, তাকে পরে রাজনীতির বাইরে পাঠান বিলকিস জাহান শিরিন। কেউ কেউ বলছেন, ভবিষ্যৎ বিবেচনায় এটি তিনি করেছেন আহসান হাবিব কামালের ইন্ধনে।
একটি টেলিভিশনে করা কমেন্ট ব্যবহার করে বিলকিস জাহানের খেলায় কুপোকাত সেই উপকারী রাজনীতিক এখন ছোটখাটো ব্যবসা নিয়ে আছেন, আর অবসর কাটান বরিশাল ক্লাবে আড্ডা দিয়ে।
এদিকে বিলিকিস জাহান শিরিনের নাম ব্যবহার করে বরিশাল নগরীর যে পুকুরটি ভরাট করা হয়েছে, সেটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং ভরাটের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব কার? চাইলে কোনো পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা যায় না। এ ব্যাপারে আইনের স্পষ্ট প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কোনো জলাশয় অবৈধভাবে ভরাট করা হলে মহানগরীর প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনকেই তো এর জবাবদিহি করতে হবে।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশালে ভয়াবহ হচ্ছে হাম, ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু
বরিশালে লোডশেডিং ঘণ্টায় ঘণ্টায়
বরিশাল নগরের আলোচিত পুকুরে এখন ঘুমায় কুকুর!
বরিশালে আনসার নিয়োগে ঘুস-বাণিজ্য, তোলপাড়!
বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার