মৃত্যুফাঁদের মহাসড়ক ধরে ঈদে বাড়ি ফিরছে বরিশাল অঞ্চলের মানুষ। এতে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনা আর হতাহতের সংখ্যা। শুক্রবারও এই সড়কে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন ৩৫ বছরের এক যুবক। দেড় মাসে এভাবে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬১। পদ্মা সেতু চালুর পর যানবাহনের চাপ শতগুণ বাড়লেও প্রশস্ত হয়নি মহাসড়ক। উপরন্তু বিপদ বাড়াচ্ছে সড়কে থাকা ৩৮টি বিপজ্জনক বাঁক। যেসব বাঁকে প্রায়ই দুর্ঘটনাকবলিত হচ্ছে যানবাহন। সবমিলিয়ে যেন লাশের মিছিল রাজধানীসহ সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে। সড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করার কাজও থমকে আছে বহু বছর। দুর্ঘটনার মাত্রা কমাতে আপাতত সড়কটিকে ৩৪ ফুট প্রশস্ত করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
রাজধানীসহ সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ প্রশ্নে লঞ্চই ছিল একসময় বরিশাল অঞ্চলের প্রধান ভরসা। বিভাগের ৬ জেলা আর ৪২ উপজেলা থেকে লঞ্চে ঢাকায় যেত মানুষ। সড়কপথে যোগাযোগ থাকলেও পদ্মা নদীর কারণে বরিশাল থেকে ঢাকায় যেতে লাগত ৮/১০ ঘণ্টা। পদ্মা সেতু চালুর পর সেই সময় নেমে আসে ৩/৪ ঘণ্টায়। অন্যান্য জেলা-উপজেলা থেকেও এখন সড়কপথে কম সময়ে যাওয়া যাচ্ছে ঢাকায়। এতে এই মহাসড়কে বেড়েছে যানবাহন। রোড সেফটি মুভমেন্ট নামে একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক প্রায় আড়াই লাখ মানুষ যাতায়াত করে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে, যা আগের তুলনায় প্রায় দেড়শগুণ। সড়কপথে চলাচলে সময় কম লাগায় নৌপথের তুলনায় পণ্য পরিবহণও বেড়েছে আলোচ্য এই মহাসড়কে। বেড়েছে ট্রাকসহ পণ্য পরিবহণকারী যানবাহনের সংখ্যা। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা এভাবে শতগুণ বাড়লেও সেই তুলনায় প্রশস্ত হয়নি মহাসড়ক। ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৬ লেন এক্সপ্রেসওয়ে হলেও ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা সড়কটির অধিকাংশ জায়গা এখনো রয়ে গেছে আগের প্রস্থে। কোথাও ১৮ আবার কোথাওবা ২৪ ফুটের বেশি প্রশস্ত নয় সড়ক। পরিস্থিতি এমন যে, নামমাত্র এই মহাসড়কের কিছু কিছু জায়গায় দুটি বাস পাশাপাশি একে অপরকে অতিক্রম করাও হয়ে পড়ে বিপজ্জনক।
বাসচালক আলাউদ্দিন বলেন, ‘ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে প্রতিমুহূর্ত যেন লড়াই করতে হয় স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে। যে সংখ্যক গাড়ি চলে, সেই তুলনায় সড়ক সরু হওয়ায় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। তারপর রয়েছে ব্যাটারি আর গ্যাসচালিত থ্রি-হুইলারের যন্ত্রণা।’ ঈগল পরিবহণের বাসচালক সাত্তার মিয়া বলেন, ভাঙ্গা পার হওয়ার পর টেকেরহাট পর্যন্ত মোটামুটি সোজা এই মহাসড়ক। তারপর শুরু একের পর এক বিপজ্জনক বাঁক। কিছু বাঁক আছে উলটো দিক থেকে আসা যানবাহন চোখেই পড়ে না। বিশেষ করে মাদারীপুর থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত এলাকা। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে সড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, যে ৩৮টি বাঁকের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো আমরাও চিহ্নিত করেছি। সেসব জায়গায় প্রশস্ততা বাড়িয়ে সড়ক সোজা করার চেষ্টা চলছে। তবে এতে খুব একটা উপকার হচ্ছে না।
ঈদযাত্রায় শুক্রবার বিকালে ঢাকা থেকে বাসে বরিশালে এসেছেন নবগ্রাম এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুল হক। তিনি বলেন, ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত সড়কে অন্তত ৪টি দুর্ঘটনা চোখে পড়েছে। কেউ মারা গেছে কি না জানি না। তবে নিজের চোখে দেখেছি রাস্তার পাশে ট্রাক আর ছোট গাড়ি উলটে পড়ে আছে।
রোড সেফটি মুভমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মাসুদুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনাগুলোর মূল কারণ হচ্ছে মহাসড়কের অপ্রশস্ততা। বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ৬ লেন না হলে এই মহাসড়কে যেমন গতি বাড়বে না, তেমনই বন্ধ হবে না মৃত্যুর মিছিল। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান বলেন, ফরিদপুর থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত ২৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। মাদারীপুর অংশের জমি অধিগ্রহণের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বরিশাল থেকে লেবুখালী পায়রা ব্রিজ পর্যন্ত যে অধিগ্রহণ, তাও ১/২ মাসের মধ্যে শেষ হবে। এরপর বাকি থাকে ফরিদপুর অংশ। যতদূর জানি, সেখানকার জমি অধিগ্রহণ শেষ হতে ৩/৪ মাস লাগবে। এগুলো হয়ে গেলেই শুরু হবে মূল প্রকল্পের কাজ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব দাখিল করেছি। অর্থ সহায়তা দিতে দাতা সংস্থারও আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, ফরিদপুর থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত বর্তমান যে মহাসড়ক, সেটির প্রস্থ ৩৪ ফুটে উন্নীত করার কাজ চলছে। ৬ লেন না হওয়া পর্যন্ত এই ৩৪ ফুট প্রস্থ পেলেও আশা করি মহাসড়কে যানবাহন চলাচল মোটামুটি সহজ হবে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমবে।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)