বরগুনার পাথরঘাটায় চাঞ্চল্যকর এসিড মামলার বাদী ও তাঁর নাবালক সন্তানকে জনসমক্ষে হেনস্তার ও মারধরের পর এবার আদালত চত্বরেই প্রকাশ্য দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রধান আসামির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, মামলা তুলে নিতেও বাদীর ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সাক্ষীদের ওপর দফায় দফায় হামলা ও নানা ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
মামলার নথিপত্র ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, গত ৯ মে ২০২৬ তারিখে পূর্ব শত্রুতার জেরে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের পশ্চিম মাথা এলাকার ভাড়া বাসায় অতর্কিত হামলা চালায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও বখাটে ব্যক্তিরা। ১ নং আসামি আবুল বাশার বাদশা আকন এর হাতে থাকা প্লাস্টিকের বোতল থেকে নিক্ষিপ্ত এসিডের দাহ্য পদার্থ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাদীর পাঁচ বছরের শিশুকন্যা ও ১ নং সাক্ষী জাইমার বাম হাতে গিয়ে পড়ে। এতে তার মাংস ও চামড়া ঝলসে গিয়ে গুরুতর জখম হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় শুরুতে থানা পুলিশ মামলা গ্রহণ না করায় পরবর্তীতে বিজ্ঞ এসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী ফাতিমা জমাদার অর্পা। আদালতের নির্দেশে পাথরঘাটা থানায় এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ এর ৫(খ)/৭ ধারায় মামলাটি (জি.আর. মামলা নং- ১০৫/২০২৬) রেকর্ড করা হয়।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী উজ্জ্বল চক্রবর্তী জানান, এসিড অপরাধ একটি অত্যন্ত গুরুতর ও অদম্য অপরাধ। এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণে বাদীকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও আইন পরিপন্থী। আমরা আদালতের নজরে বিষয়টি এনেছি এবং আসামির জামিন বাতিল ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মামলার ২ নং সাক্ষী ও স্থানীয় বাসিন্দা শামীম হাং বলেন, “গত ৭ জুলাই রাতে কাঠালতলী এলাকায় আসার পর ১ং আসামি বাদশা আকন অন্ধকারে আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং এসিড মামলায় সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেয়। আমরা আইনের আশ্রয় নিতে গেলেই আসামিরা আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘটনাস্থলের স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “বাদীর ওপর এর আগেও একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে। থানার সামনেও আসামিরা হেনস্তা করেছে। এসিড আক্রান্ত শিশুটির আর্তনাদ আমরা দেখেছি, এখন আসামিদের অব্যাহত হুমকিতে পুরো এলাকাবাসী আতঙ্কিত।”
গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আদালতে জামিন শুনানি শেষে বের হওয়ার সময় ঘটিত দৃশ্যত্য সম্পর্কে আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “আদালতের বারান্দায় আসামির এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বিচারব্যবস্থার প্রতি এক ধরণের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। বাদীকে উদ্দেশ্য করে যেভাবে তুই-তোকারি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
সেখানে উপস্থিত অপর এক বিচারপ্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা নিজের চোখে দেখেছি আসামি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বাদীকে হুমকি দিয়ে বলছে—‘আমারে আটকাইছস, তোরেও আমি দেখে নেব।’ আদালত চত্বরে যদি এমন প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ থাকবে?”
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ফাতিমা জোমাদ্দার অর্পা বলেন, “আমি ও আমার মামলার সাক্ষীরা কেউ নিরাপদ নই। এই আসামি বিভিন্ন সময় আমার সন্তানদের হত্যা করার হুমকি দিয়েছে। এমনকি আমাদের লাশ গুম করার হুমকিও দিচ্ছে। প্রায়ই আমার বাসার সামনে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। আমি এবং আমার সন্তানরা সবসময় তার ভয়ে ততস্থ থাকি। আসামি আমাদের যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। আদালতের জামিনের সুযোগ নিয়ে আসামি যেভাবে প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে, তাতে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
অভিযুক্ত আবুল বাশার বাদশা আকন এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, ফাতেমা প্রথমে তার ও তার ছেলের বিরুদ্ধে এসিড আইনে একটি মিথ্যা মামলা করেন এবং পরবর্তীতে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে, এমনকি তার বিরুদ্ধে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবির অবান্তর অভিযোগ তোলেন। বিভিন্নভাবে এসব অপপ্রচারের মাধ্যমে তাকে ক্রমাগত সামাজিক ও মানসিকভাবে হেয় করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। নন-জিআর মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বাদীকে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। দ্রুত অভিযুক্ত আসামির জামিন বাতিল করে তাঁকে কঠোর আইনের আওতায় আনার জন্য বিচারক ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আকুল আবেদন জানিয়েছেন অসহায় ওই নারী ও তাঁর পরিবার।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহনন, লিখে গেছেন ৫ চিঠি
বেহাল দশা বরিশালের দুই বাসটার্মিনাল
৪-৫ বছরের মধ্যে ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে : নৌপরিবহনমন্ত্রী
বরিশালে ঘুস ছাড়া কিছুই হয় না ভূমি দপ্তরে
ভিত্তিপ্রস্তরের ৯ মাসেও শুরু হয়নি মীরগঞ্জ সেতুর কাজ