রক্তস্নাত ১৫ আগস্ট: প্রতিবিপ্লবীদের বিজয় দিবস -মানবেন্দ্র বটব্যাল
(শেষ অংশ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্রথম থেকেই ছিল নানামুখি ষড়যন্ত্র। কিন্তু মহামতি লেলিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া স্ট্যালিন থেকে শুরু করে ক্রুশ্চেভ বা পরবর্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধানদের দৃঢ়তার কারনে তা সফল হচ্ছিলনা। উলেখ্য নাৎসী জার্মান সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানীদের সাথে হাত মেলায় জাপান সহ আরো কয়েকটি দেশ। কিন্তু নাৎসী জার্মান কিছুতেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাস্ত করতে পারছিলনা। জার্মানীদের পরাজয় যখন শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষায় ছিল তখন জার্মানী যুক্তরাজ্যের অধিকৃত ভারত সহ কয়েকটি স্থানে হামলা চালালে যুক্তরাজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। এসময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠন করা হয় মিত্র বাহিনী। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপে আরো কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম নেয়ায় মার্কিনীরা তাদের কৌশল বদলায়। আর এসময়েই অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি গরভাচেভের উদারপন্থী নীতি গ্রহন করার যুযোগ নিয়ে (আমার মতে সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চর ঢুকিয়ে দিয়ে) প্রায় ৭০ বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোরও পতন ঘটে।
অবশ্য এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল পোলান্ডে শ্রমিক আন্দোলনের নামে। অতি সাম্প্রতিক কালে বিপবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এবং আগে পরোক্ষভাবে মার্কিনীদের পক্ষে থাকলেও ক্রমশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বিরোধী হওয়া রাষ্ট্র তিউনিসিয়া, ইরাক, লিবিয়ায় মার্কিনীদের প্রত্যক্ষ মদদে এবং ইরাকে সরসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কদের হত্যা করে সেখানে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একেই মাকির্নীরা ‘আরব বসন্ত’ নামে আখ্যায়িত করেছে। এখনও চেষ্টা চলছে সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঘটানো, ইসরাইলের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। অর্থাৎ যেখানেই মাকির্নীদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেখানেই হয়েছে প্রতিবিপব। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিলুপ্তির পর ভারসাম্যহীন পৃথিবীতে এখন মার্কিনী যুদ্ধবাজরা বিশ্বে একক মোড়লগিরি দেখানোর মহাসুযোগ পেয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি পদগর্নির দৃঢ়তার কারনে মার্কিনী সপ্তম নৌবহর পিছু হটতে বাধ্য হয়।
কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। এমনকি ১৯৭০ সনের নির্বাচনের পর একক সংখ্যগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু যাতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভার গ্রহন করতে না পারেন তারজন্য এমন কোন জঘন্য কাজ নেই যা পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের প্রধান জুলফিকর আলী ভূট্টো করেননি। মার্কিনীদের সমর্থনপুষ্ট ভূট্টো সরসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাত করতে সব কিছুই করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জুলফিকার আলী ভূট্টো খন্ডিত পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানকে দীর্ঘদিনের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রন থেকে মুক্ত করে নিজ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিলে সেখানকার সামরিক বাহিনী তাকে উৎখাত করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। তার কন্যা বেনজির ভূট্টোও পাকিস্তানের পুরানো ধ্যান ধারনার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক পাকিস্তান গড়ার প্রচেষ্টা নিলে তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিশ্বরাজনীতিতে তাই বলা হয় আমেরিকা যার বন্ধু তার আর শত্র“র প্রয়োজন হয়না।
বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বঙ্গবন্ধু জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনকে শক্তিশালী করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নেন। তাঁকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের পক্ষ থেকে ‘জুলিও কুরি’ পদক দেয়া হয়। আর এই পদক তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন বিশ্বের বিপবী আন্দোলনের অবিংসবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো। এসময়ে ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে মার্কনীদের সম্পর্কে সাবধান থাকার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকার মার্কিনীদের অমতে কিউবাকে স্বীকৃতি দেয় এবং মার্কিনীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিউবা,সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে ব্যবসা বানিজ্য শুরু করে। এমনকি নিজের দেশেও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। আর সব ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ( যা পরবর্তিতে জাতীয় সরকারের রূপ নিত) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এসময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ যেসব দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল তারা তখন প্রমাদ গুনল। তারা বুঝতে পারল যদি বঙ্গবন্ধুর এই দ্বিতীয় বিপব সফল হয় তাহলে অচিরেই বিশ্বে আরেকটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হবে। আর এসময়েই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে হাত মেলায় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তিরা।
তারা দেশে একটি প্রতিবিপব ঘটানোর ষড়যন্ত্র শুরু করে। অবশ্য এই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল বহু আগের থেকেই। সেকারনেই বন্ধু বেশী ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে প্রভাবিত করে প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক তাজউদ্দিন আহমেদকে মন্ত্রী পরিষদ থেকে বিদায় দিয়ে, তাকে রাষ্ট্রপরিচালনায় নিষ্ক্রিয় করে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দিন আহমেদের দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলতে সক্ষম হয়। সংবিধান সংশোধন করে বাকশাল গঠনের জন্য জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপিত হলে আওয়ামী লীগ দলীয় তিনজন সাংসদ প্রস্তাবের বিরোধীতা করে দল থেকে বের হয়ে যান। শুরু হয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেবার মরন কামড়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সুফলগুলো ব্যর্থ করে দেবার কার্যক্রম শুরু করে। সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং সেনাবিহনী থেকে বিদায় নেয়া বিভিন্নস্তরের সদস্যদের একত্রিত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথি প্রকাশের পর এখন এটা পরিস্কার যে, বাংলাদেশে প্রতিবিপব ঘটাতে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিকল্পিত। দেশের রাজধানী সহ সর্বত্র একটি উৎকন্ঠা দেখা দেয়। আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো থেকে বঙ্গবন্ধুকে সেনাবাহিনীতে চলমান ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অবহিত করা হলেও দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া রাজনীতিক উদার মনের মানুষ বঙ্গবন্ধু সেসব তথ্যকে আদৌ গুরুত্ব দেননি।
বাংলাদেশের মানুষ তাকে হত্যা করতে পারে বা তার বিরুদ্ধাচারন করতে পারে বা তার সরকারের পতন ঘটাতে পারে এরকম কোন বিশ্বাস তাঁর ছিলনা। নিজে ছিলেন দারুনভাবে আত্মবিশ্বাসী। আর এই ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়নে শিখন্ডি হিসাবে ব্যবহার করা হয় উচ্চাভিলাষী জাতীয় বেঈমান আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোস্তাককে। তার পেছনে ছিল আওয়ামী লীগের আরও বেশ কিছু সংখ্যক নেতা। বঙ্গবন্ধু এসব দলীয় নেতাদের বিশ্বাস করলেও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দিন আহমেদ কিন্তু এদের আদৌ বিশ্বাস করেননি। আর বঙ্গবন্ধুর উদারতার সুযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা রক্তস্নাত ১৫ আগস্ট জন্ম দিতে পারল। ১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লবের পর ৩ নভেম্বর জেলখানায় প্রাণ হারালেন তাজাউদ্দিন আহমেদ সহ জাতীয় চার নেতা। সফল হল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের আদর্শগুলোকে বিফল করার প্রতিবিপ্লব। প্রতিবিপ্লব সফল হবার পর পাকিস্তান, চীন, সৌদি আরব সহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। খোন্দকার মোস্তাকের অবৈধ সরকার প্রতিবিপ্লবে অংশ নেয়া প্রকাশ্য ব্যক্তিদেরকে দায়মুক্তির আইন করে খুনীদেরকে বিচারের হাত থেকে রক্ষা করার আইন প্রণয়ন করেন।
শিখন্ডি খন্দকার মোস্তাকের দ্বারা প্রতিবিপ্লবের প্রথম পর্ব শেষ হবার পরে মঞ্চে আবির্ভূত হলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। বাধ্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা জিয়াউর রহমান শেষ পর্যন্ত খলনায়কের চরিত্র ধারন করে তিনি শাসকের মসনদে বসলেন। পরে তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সংবিধানের চরিত্র হনন করা হল। জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে বক্তৃতা করা ও স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী শাহ আজিজুর রহমান তার সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন। আরো কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীপরিষদের সদস্য হলেন। জয়বাংলা ম্লোগান নির্বাসিত হল। বাংলাদেশ বেতার হল পাকিস্তান রেডিওর অনুকরনে বাংলাদেশ রেডিও। পাকিস্তান সহ অন্যান্য রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল। বিভিন্ন অজুহাতে তার শাসনামলেই সেনাবাহিনীতে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের বহু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের বহু অর্জনকে বর্জন করা হয়। পিছু পথে চলতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে। দেশটাকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করা হয়। তার আমলেই ১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লবীদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রতিবিপ্লবীদের অন্যতম প্রকাশ্য নেতা কর্নেল রশিদ বিবিসি’র সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তাদের ১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লবী কার্যক্রমে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান।
সেনাবাহিনীর অন্তর্দ্বলীয় কোন্দলের কারনে জিয়াউর রহমান নিহত হলেন। পরবর্তিতে দৃশ্যপটে আসলেন মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান থেকে যেসব বাঙালি সেনা সদস্য বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার উদ্যোগ নিয়েছিল সেসব সেনা সদস্যদের বিচারের জন্য পাকিস্তানে গঠিত কোর্ট মার্শালের বিচারক (!) জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। তিনি দেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতাকে বর্জন করে ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে সংবিধানে সংযোজন করেন। দেশে অমুসলিম নাগরিকরা রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। তার আমলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। তার মন্ত্রী পরিষদে স্থান পেল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারি মাওলানা মন্নান, কায়সার সহ অন্যরা। পরবর্তিতে ক্ষমতায় আসা জিয়াউর রহমান যখন মুক্তিযুদ্ধ করছেন তখন পূর্বপাকিস্তানী ক্যান্টনমেন্টে সুখি জীবন যাপন করা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সনে সরকার গঠন করেন। । দীর্ঘ একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে পারলেও ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করে বেশীদূর এগুতে পারেনি। তারপর মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধীতাকারী জামায়াতকে সাথে নিয়ে ক্ষমতায় আসলেন বেগম খালেদা জিয়া। জামাতের দুই শীর্ষ নেতা মন্ত্রী পরিষদে ঠাঁই পেলেন। এসময়েই আবার বাংলাদেশকে ধর্মান্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয়।
প্রতিবিপবের ফসল হিসাবে ইতোমধ্যে শেকড় গেড়ে বসা ধর্মান্ধ জঙ্গীগোষ্ঠী শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার বোমা,গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে। একসাথে দেশের ৬৩ জেলায় বেমা হামলা করে এরা যে কতটা শক্তিশালী তার প্রমান রেখেছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া, শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ সহ অপরাপর নেতাদেরকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবিপবীদের মদদে হৃষ্টপুষ্ট হওয়া জঙ্গীরা বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রিয় সম্মেলনে, সিপিবি সমাবেশে, দেশের বিভিন্নস্থানে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে। আইন অঙ্গনে বেমাবাজি করে দুজন বিচারক সহ অন্যদেরকে হত্যা করেছে। ২০০৮ সনের পরে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করার পর আবারো নতুন করে এরা সংগঠিত হয়েছে। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে নানারূপ বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। ৪২ বছর পর কেন ‘দেশটাকে দুভাগে বিভক্ত করা হচ্ছে’ তার প্রশ্ন তুলছে। এরা বিদেশেও লবিং করছে। তাইতো মাঝে মাঝে বিদেশী প্রতিনিধিরা এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানরূপ মন্তব্য করছে। অথচ স্বাধীনতার ৩৫ বছর পর কম্বোডিয়ায় গত ৭ আগস্ট একজনকে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে সেদেশের যুদ্ধাপরাধী বিচারের ট্রাইবুনাল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় ৭০ বছর আগে। কিন্তু এখনও ন্যুরেমবার্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি আবারো একটি প্রতিবিপ্লব ঘটানোর চেষ্টায় লিপ্ত আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। এর কিছু রূপ আমরা দেখেছি গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসে। ১৯৯১ সনে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবার পর থেকে একটি বিতর্কিত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এখনও ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই অপশক্তি আবার যেকোন সময়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অর্জনগুলোকে ধ্বংশ করতে আবারো একটি প্রতিবিপ্লব ঘটাতে পারে বলে অনেকে ধারনা করছেন। তাই এখনই সাবধান হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বর্তমান শাসক দল সেসম্পর্কে কতটুকু সজাগ আছেন তা নিয়ে আমার সংশয় আছে। এই বলে শেষ করতে চাই আত্মবিশ্বাসী না হলে কিছু অর্জন করা যায়না। কিন্তু আত্মম্ভরিতা বিপর্যয়ও ডেকে আনে। তাই সাধু সাবধান।
লেখক: প্রবীণ সাংবাদিক, আইনজীবি ও দৈনিক সংবাদের বরিশাল প্রতিনিধি।
|