সড়ক দুর্ঘটনার নেপথ্যে-২ বরিশালে বৈধ’র চেয়ে দ্বিগুন অবৈধ মোটরযান সাইফ আমীন

বরিশাল বিআরটিএ অফিসের পরিসংখ্যান বলছে জেলায় রেজিস্ট্রেশন করা বৈধ বাস রয়েছে ৬০ টি, মিনি বাস ১১০ টি, ট্রাক ২৫০ টি। আলফা মাহিন্দ্রা, রিয়ো , পিয়াজিয়োসহ থ্রি-হুইলার যান রয়েছে ৭১৫ টি।
তবে এ পরিসংখ্যানটি সঠিক হলে নগরী কিংবা জেলার কোথাও দেখা যেত না যানজট ।
আর সড়কগুলোতে ঘটতো না এত দূর্ঘটনা । হারাতে হত না এত প্রান।অর্থাৎ অবৈধ যান চলারণ বন্ধে যাদের কঠোর পদক্ষেপ জরূরী সেই গোড়ায় রয়েছে গন্ডগোল। এমনটাই মন্তব্য করেছেন নগরবাসী।
সংশ্লিস্ট সূত্র জানায় , জেলায় চলাচলরত ফিটনেস বিহীন লক্কর ঝক্কর মার্কা বাস, মিনিবাস ,মাইক্রোবাস, ট্রাক ও বালুবাহী ট্রাকের সংখ্যা ৫ শতাধিক ।
আর সহস্রাধিক আলফা মাহিন্দ্রা, রিয়ো , পিয়াজিয়ো হিউমান হুলার চলছে সড়ক দাবড়িয়ে। এসব অবৈধ যানবাহন দিয়ে বরিশাল বিআরটিএ অফিসে আসে লক্ষাধিক টাকা মাসোয়ারা।
কয়েক বছর আগে একটি সার্ভেতে দেখা গেছে জেলার ৬০ ভাগ বাসেরই ফিটনেস নেই।
যে কারণে অভ্যান্তরীণ রুটে লক্কর ঝক্কর মার্কা বাস, মিনিবাসের কারনে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ হয় না। এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ীর কারনে কয়েক দিন পর পরই ঘটেল চলছে সড়ক দূর্ঘটনা । হতাহত হচ্ছে যাত্রীরা।
অন্যদিকে , বরিশাল মহানগরীর আয়তন অনুপাতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈধ ও অবৈধ গন পরিবহন। ফলে অসহনীয় যানজটে নাকাল বরিশালবাসী। এরপরেও পুড়ানো গাড়িই ঘষে-মেজে সার্ভিসে নামাচ্ছেন বাস মালিকরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বয়জেষ্ঠ্য এক শ্রমিক নেতা জানান, গত কয়েক বছরে বাস মালিক সমিতির দাপটে সে ভাবে কোন নতুন বাস ঢুকতে পারেনি বরিশাল-ভূরঘাটা, বরিশাল-পয়সারহাট, বরিশাল-মুলাদী, বরিশাল-বানারীপাড়া, বরিশাল-সাতলা, বরিশাল-লাজঘাট (ভূতের দিয়া), ভূরঘাটা-বানারীপাড়া ভায়া বরিশাল, বরিশাল-ঝালকাঠী, বরিশাল-বাকেরগঞ্জ, বরিশাল-নিয়ামতি ভায়া বাকেরগঞ্জ, বরিশাল-পাদ্রিশিপপুর ভায়া বাকেরগঞ্জ, বরিশাল-ডিসিঘাট ভায়া বাকেরগঞ্জ পেয়ারপুর, বরিশাল-ভোলা, বরিশাল-মোল্লারহাট ভায়া দপদপিয়া নলছিটি, বরিশাল-বাবুগঞ্জ ভায়া লাকুটিয়া, বরিশাল-কড়াপুর, বরিশাল-নবগ্রাম ভায়া কড়াপুর ও বরিশাল-তালতলীর অভ্যন্তরীণ রুট গুলোতে।
বয়জেষ্ঠ্য ওই শ্রমিক নেতা আরো জানান, কোন বাসের ধারন ক্ষমতা ৩০ সিট। তবে বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিলে সেটাকে ৪০ সিটের গাড়ী করা অসম্ভব নয়। রং করে অনেক পুরনো গাড়ীকেও মেয়াদ আছে বলে চালানো হয়। শুধু তাই নয় বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তাদের অর্থ দিয়ে চোরাই গাড়ীরও নিবন্ধিত করা যায়।
বরিশাল বিআরটিএ সূএ জানায়, ২০১০ সালে সাবেক সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরন পুরানো লক্কর ঝক্কর মার্কা টু-স্টোর্ক টেম্পু নগরীতে চলাচল বন্ধের ঘোষনা দেন।
এরপরই নগরীতে কিছু ভারতীয় আমদানীকৃত আলফা মাহিন্দ্রা টেম্পু চলাচল শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় মেট্রো এলাকায় আলফা মাহিন্দ্রা চলাচলে রেজিষ্ট্রেশন এবং রুট পারমিট পাওয়ার জন্য ব্যক্তি পর্যায় আবেদন করেন।
২০১০ সালের ২ সেপ্টেম্বর বরিশাল মেট্রোপলিটন আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সভায় ৪ আসন বিশিষ্ট ২৫০ টি আলফা মাহিন্দ্রা বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকায় চলাচলের অনুমোদন দেয়া হয়।
এরপর ২০১১ সনের ১৭ জানুয়ারী মেট্রোপলিটন আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সভায় আরও ৭৫টি মাহিন্দ্রা চলাচলের (রুট পারমিট) অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে ২০১১ সনের ২০ মে মাসে আরও ৫০টি মাহিন্দ্রা চলাচলের অনুমোদন দেয়। ৩৭৫টি আলফা মাহিন্দ্র রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট প্রদানের পর ২০১২ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারী বরিশাল মেট্রোপলিটন আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সভায় নতুন ভাবে ২৫০টি আলফা মাহিন্দ্রা , রিয়ো ও পিয়াজিয়ো ব্রান্ডের যানের রেজিষ্ট্রেশন সহ রুট পারমিট প্রদান করেন।
২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট আলফা মাহিন্দ্রা ও পিয়াজিয়ো রিয়ো ব্রান্ডের ৭১৫ টি যান রেজিষ্ট্রেশন সহ রুট পারমিট প্রদান করা হয়েছে বলে জানায় বরিশাল বিআরটিএ অফিস।
তবে অভিযোগ রয়েছে এই সংখ্যার বাইরেও জেলায় সহস্রাধিক আলফা মাহিন্দ্রা, হিউমান হলার রিয়ো ও পিয়াজিয়ো অবৈধভাবে চলাচল করছে ।
আলফা মাহিন্দ্রা, রিয়ো , পিয়াজিয়ো হিউমান হলারের একাধিক শ্রমিক জানন , রূপাতলী- লঞ্চঘাট, রূপাতলী -নথুল্লাবাদ, রুপাতলী- কালিজিরা, রূপাতলী -দপদপিয়া ফেরিঘ্টা চৌমাথা-বৌশের হাট, চৌমাথা-পপুলার, কাশিপুর-বৌশেরহাট, নথুল্লাবাদ-রহমতপুর, নথুল্লাবাদ-বানারীপাড়া, নথুল্লাবাদ-বারজ্জাইরহাট, নথুল্লাবাদ-উজিরপুর, নতুন বাজার-লাকুটিয়া, বাকলার মোড়-তালতলি, তালতলী-লামছড়ি, বেলতলা খেয়াঘাট-বরিশাল বাজার রোড, সাগরদী-টিয়াখালী, লঞ্চঘাট-নথুল্লাবাদ, লঞ্চঘাট-রুপাতলীসহ জেলার বিভিন্ন রুটে ২ হাজারের মত থ্রি হুলার যান চলাচল করে ।
এর মধ্যে সহস্রাধিক আলফা মাহিন্দ্রা, রিয়ো , পিয়াজিয়ো হিউমান হলার চলছে অবৈধ ভাবে। আলফা মাহিন্দ্রা মালিক সমিতির নেতাদের মাসিকভাবে টাকা প্রদান করলে বরিশাল বিআরটিএ অফিস সামলানোসহ বৈধ-অবৈধের সব দায় দায়িত্ব তারাই নেয় বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা।
অন্যদিকে, কয়েক মাস আগে বরিশাল বিআরটিএতে ‘জনগণের দুর্ভোগ’ বিষয় একটি রিপোর্ট বেসরকারী একটি টেলীভিশনের সংবাদে প্রচারিত হয়। এর প্রেক্ষিতে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি নগরীর বিআরটিএ কার্যালয়টি পরিদর্শন করেন। তবে তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমান মিলেছে কিনা বা তদন্তের পর কি ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে তা কিছুই জানাতে পারেনি বিআরটিএ অফিস।
বরিশাল আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ২১ মার্চ মানিকগঞ্জ থেকে জনৈক মশিউর রহমান নামে এক ব্যক্তির মাইক্রোবাস চুরি হয়। গত ১৯ ডিসেম্বর বিআরটিএ ঢাকার অফিস থেকে তিনি জানতে পারেন চুরি যাওয়া মাইক্রোবাসটি বরিশালে রয়েছে। পরে তিনি জানতে পারেন বরিশাল বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে তার চুরি যাওয়া মাইক্রোবাসটি অন্য এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত হয়েছে।
এ ঘটনায় মশিউর রহমান বাদী হয়ে তৎকালীন বিআরটিএ বরিশাল অফিসের ২ কর্মকর্তাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন।
আলফা মাহিন্দ্রা মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক মো. ফরিদ আমাদের বরিশাল ডটকম’কে জানান, বৈধ ৭ শতাধিক থ্রি হুইলার যান রয়েছে। প্রতিদিন এসব যান থেকে স্ট্যান্ড ফি বাবদ ১০ টাকা করে সমিতি আদায় করে। এর বাইরে অতিরিক্ত কোন অর্থ নেয়া হয়না।
জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আাফতাব হোসেন জানান, তাদের সমিতির আওতায় ১৫টি রুটে ১৮০টি বাস চলাচল করে। এর মধ্যে কয়েকটি মেরামত করে চলছে।
গাড়ির ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট করতে উৎকোচ দিতে হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারী কিছু কিছু দপ্তরে টাকা ছাড়া কাজ হয় না নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে । তবে বাস মালিক সমিতির ব্যানারে গেলে খুব একটা হয়রানী করেনা । কাজ হয়ে গেলে তাদের খুশি করতে হয়।
বরিশাল-পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক কাওছার হোসেন শিপন আমাদের বরিশাল ডটকম’কে জানান, তাদের সমিতির আওতায় ১৪ টি রুটে ১১১টি বাস চলছে। বিআরটিএ’র নোটিশ পেলে ফিটনেসবিহীন বাস মালিকদের এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়। এছাড়া ৬ মাস পর পর মালিকরা তাদের বাসের যান্ত্রিক ত্রুটি সেরে নেয়। ২/৪টা ফিটনেসবিহীন বাস থাকতে পারে বলে তিনি দাবি করেন ।
বিআরটিএ’র অফিসে গেলে উৎকোচ লাগে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারী ফি’র চেয়ে কিছু টাকা হয়তো বেশী নেয়। তবে এতে খুব বেশী সমস্যা হয়না।
বিআরটিএ বরিশাল সার্কেলের সহকারী পরিচালক এম ডি শাহ আলম আমাদের বরিশাল ডটকম’কে বলেন, জেলায় রেজিস্ট্রেশন করা বৈধ বাস রয়েছে ৬০ টি, মিনি বাস ১১০ টি, ট্রাক ২৫০ টি। আলফা মাহিন্দ্রা, রিয়ো , পিয়াজিয়োসহ থ্রি-হুইলার যান রয়েছে ৭১৫ টি। এ সংখ্যার বাইরে জেলায় শতাধিক যান চলাচল করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দুর্নীতির বিষয় বলেন , ‘বর্তমানে অনলাইন ব্যবস্থায় এ অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোন প্রকার ঘুষ-দুর্নীতির সুযোগ নেই।’ যদি কেউ এধরনের অভিযোগ করে থাকে তা ভিত্তিহীন। সরকারী নির্ধারিত ফি’র বাইরে এক পয়সাও বেশী নেয়া হয় না।
সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক |