Home » কলাপাড়া » পটুয়াখালী » কুয়াকাটা:সাগর আছে, সম্ভাবনাও আছে, ঘাটতি শুধু পরিকল্পিত উন্নয়নে
২৪ September ২০২৬ Thursday ৬:৪৪:৫৮ PM
কুয়াকাটা:সাগর আছে, সম্ভাবনাও আছে, ঘাটতি শুধু পরিকল্পিত উন্নয়নে
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
সাগরকন্যা কুয়াকাটার সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন পর্যটকরা। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের। পদ্মা সেতু চালুর পর পর্যটকের আনাগোনাও বেড়েছে। কিন্তু পর্যটনের এই সম্ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।
একদিকে সমুদ্রের অব্যাহত ভাঙনে বদলে যাচ্ছে সৈকতের চেহারা, অন্যদিকে অপরিকল্পিত স্থাপনা, জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনাকে চাপে ফেলছে। দীর্ঘদিন আগে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এক যুগেরও বেশি আগে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর সেই মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর প্রায় ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও পরিকল্পনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
এর মধ্যে কুয়াকাটার পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অবশ্য থেমে নেই। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান ও পরিবহনসহ বিভিন্ন ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামোর তুলনায় এসব উন্নয়ন অনেকটাই বিচ্ছিন্নভাবে হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের ভাষ্য, কোথাও হোটেল হয়েছে, কোথাও দোকান বা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কিন্তু পর্যটন ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, যোগাযোগ ও নাগরিকসেবাকে একই পরিকল্পনার আওতায় এনে উন্নয়ন করা হয়নি।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও রয়েছে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা। জমির মালিকানা, কাগজপত্র, জমির ব্যবহার, ভবন নির্মাণের অনুমোদন এবং উন্নয়নসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে জটিলতার কারণে অনেকেই বিনিয়োগে দ্বিধায় পড়ছেন। জমি কেনার পর সেখানে কী ধরনের স্থাপনা করা যাবে এবং কোন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা ও সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় সম্পদ সমুদ্রসৈকত। অথচ সেই সৈকতই এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বর্ষায় উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে সৈকতের বিভিন্ন অংশ এবং সংলগ্ন বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কমছে সৈকতের প্রস্থ, কোথাও আবার ঝুঁকিতে পড়ছে পর্যটন অবকাঠামো।
ভাঙনের প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। সৈকতসংলগ্ন স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভবিষ্যতে ভাঙনের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগেও ঝুঁকি দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটকদের অভিযোগও কম নয়। ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে কুয়াকাটায় হাজারো মানুষের সমাগম হলেও সৈকতে নিরাপদে হাঁটাচলা ও গোসলের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। জিরো পয়েন্টসংলগ্ন এলাকায় কংক্রিটের টুকরো, ইট, পাথর, ছেঁড়া জাল ও কাচের অংশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভাঙন ঠেকাতে ব্যবহৃত জিও ব্যাগ ও জিও টিউবও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে।
এ কারণে জোয়ারের সময় গোসল করতে গিয়ে পর্যটকদের আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানান। শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে রয়েছে খাবারের মান, পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের অভাব, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ে অভিযোগ।
পর্যটকদের প্রত্যাশা, কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন অক্ষুণ্ন রেখেই পর্যটনসেবা উন্নত করা হয়। তাদের মতে, প্রকৃতি কুয়াকাটাকে যে সম্ভাবনা দিয়েছে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এখনো তার সঙ্গে সমানতালে এগোতে পারেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলাপাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, সৈকতের ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পরিবেশকর্মী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কুয়াকাটার উন্নয়ন মানে শুধু বড় হোটেল বা রাস্তা নির্মাণ নয়। পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ বন, রাখাইন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিকেও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে জমি আইন, পরিবেশ আইন, পর্যটন নীতি ও মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী হোসাইন আমির বলেন, কুয়াকাটার জন্য এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত উদ্যোগ। শুধু নতুন ভবন, হোটেল বা সড়ক নির্মাণ যথেষ্ট নয়। সৈকত রক্ষা, উপকূলীয় বন সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োজনীয় অংশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ করা দরকার।
পর্যটন উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন আনু বলেন, ১৯৯৮ থেকে ২০২৬—প্রায় তিন দশকে কুয়াকাটায় সড়ক যোগাযোগ, পৌরসভা, ইন্টারনেট সেবা ও পর্যটন মোটেলের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু যে সৈকতকে কেন্দ্র করে এত আয়োজন, সেই সৈকতের উন্নয়ন ও সৌন্দর্য রক্ষায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। পরিকল্পনা গ্রহণেই দীর্ঘ সময় চলে গেছে। শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়ন জরুরি।
কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ও ভবন নির্মাণ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কুয়াকাটার পৌর প্রশাসক মো. ইয়াসীড়ন সাদেক জানান, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বেড়িবাঁধের কাছাকাছি নির্ধারিত উচ্চতার বেশি ভবন নির্মাণ করা যাবে না। দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর বিধান রয়েছে। এর মাধ্যমে কুয়াকাটার সৌন্দর্য, পরিবেশ ও পরিকল্পিত নগর কাঠামো বজায় রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি জানান, গত দুই মাসে সাতটি ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মাস্টারপ্ল্যান ও নির্মাণবিধি না মেনে নির্মাণাধীন ৩৫টি ভবনের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী, কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক এবং নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জ্যেষ্ঠ পরিকল্পনাবিদ সমন্বয়ে গঠিত কমিটি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা, ভবনের চারপাশে নির্ধারিত জায়গা, অগ্নিনিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রকৌশলীর মাধ্যমে নকশা প্রস্তুত ও অনুমোদনের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হয়।
মো. ইয়াসীড়ন সাদেক আরও বলেন, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে পৌরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। পরিকল্পিত কুয়াকাটা গড়ে তুলতে ভবন নির্মাণের আগে পৌরসভা থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ সালে প্রণয়ন করা হয় এবং পরে এর সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কুয়াকাটাকে পর্যটনসেবা, কৃষি, বিমানবন্দর, ক্রীড়া ও রেলওয়ে অঞ্চলসহ বিভিন্ন জোনে ভাগ করা হয়েছে।
সমুদ্র, প্রকৃতি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা কুয়াকাটার সামনে থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে টেকসইভাবে কাজে লাগাতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন। কারণ পর্যটক ও বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকত, পরিবেশ এবং নগর ব্যবস্থাপনাকে সুরক্ষিত রাখা না গেলে ভবিষ্যতে কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় সম্পদই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পর ককটেল বিস্ফোরণ