পদবঞ্চিত বিএনপি নেতাদের সাক্ষাৎ দিলেন না এম,পি সরোয়ার
নিজস্ব প্রতিনিধি:
বরিশাল সদর আসনের এমপি বিএনপি নেতা মজিবর রহমান সরোয়ারের বাসায় গেলে ইজ্জত নিয়ে ফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে। কখনও খোদ সাংসদ তৃণমূল নেতাকর্মী ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে সাক্ষাৎ না দিয়ে বিদায় করছেন। আবার কখনও তার পালিত কজন রাজনৈতিক সহকর্মীর দ্বারা অপমান-অপদস্থ হতে হচ্ছে। এই জনপ্রতিনিধির বাসায় গিয়ে বহু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও বেইজ্জতি হওয়ার উদাহরণ আছে। সার কথা হচ্ছে, বরিশাল-৫ আসনের এমপি বর্ষীয়ান বিএনপি নেতা সরোয়ারের সাক্ষাৎ লাভের আশায় শহরের সাধুর বটতলায় তার বাসায় গেলে বেশির ভাগ মানুষকে বেইজ্জতি হতে হয়। এই বিষয়টি নিয়ে বরিশালের নেতৃত্বস্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এতদিন কানাঘুষা বা আলোচনা-সমালোচনা শোনা গেলেও বুধবার সদর উপজেলার ৪০০/৫০০ কর্মী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সাক্ষাতে ব্যর্থ হলে তৃণমূলে ক্ষোভ ও অসন্তোস ছড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, একজন রাজনৈতিক এমপি হলে তিনি সংসদীয় আসনের সকল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। এবং তার সাথে জনসাধারণে অবাধ যোগাযোগের সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু জাতীয় সংসদের ১২৩ নং আসন অর্থাৎ বরিশাল সদরের চিত্র একদম ভিন্ন, যা মজিবর রহমান সরোয়ারের মতো অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যের কাছ থেকে জনগণ আশা করেনি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপি কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মধ্যেকার বিরোধ এবং কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। এমপি সরোয়ার অনুসারী সাবেক জামায়াত নেতা নুরুল আমিনকে আহ্বায়ক এবং সাইফুল ইসলাম আব্বাসকে সদস্যসচিব করে চলতি বছরের জুলাই মাসে ১৬১ সদস্যের কমিটি অনুমোদন করা হলে পদবঞ্চিত একটি বড় অংশ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে সরোয়ার নিয়ন্ত্রিত এই কমিটি বাতিল চেয়ে বিএনপির হাইকমাণ্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু প্রতাপশালী সরোয়ারের হস্তক্ষেপের কারণে এই অংশটি কমিটি ভাঙতে বা পদবঞ্চিতদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন। এনিয়ে তাদের মধ্যেকার প্রচন্ড রূপে ক্ষোভ এবং অভিমান আছে।
বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যার আগে অর্থাৎ ৫টার দিকে বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক সালাম রাঢ়ী, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক জিয়াউল ইসলাম সাবু, রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আজাদী হাসানাত ফিরোজ, চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের কাজী ফিরোজ, সদর উপজেলা বিএনপির আমিনুল ইসলাম পাখি, কবির মাঝি এবং রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ৪০০/৫০০ লোক এমপি সরোয়ারের সাধুর বটতলার বাসবভনে যান। তখন এমপি বাসার ভেতরে থাকায় তৃণমূলের এই অংশটি বাসার সামনে অপেক্ষা করছিলেন এবং তাদের আসার বিষয়টি সরোয়ারকে বিভিন্ন মাধ্যমে একাধিকবার অবহিত করেন। রাত গভীর হয়, কিন্তু এমপির আর দেখা মেলেনি।
এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক আজাদী হাসানাত ফিরোজ। তৃণমূল বিএনপির এই নেতা অভিযোগ করেন, ত্রয়োদশ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করে বরিশাল-৫ আসনে মজিবর রহমান সরোয়ারকে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নিজের পছন্দসই বিতর্কিত ব্যক্তি-বিশেষকে স্থানীয় কমিটিগুলোর শীর্ষ পদে আনতে কাজ করছেন। বিশেষ করে সদর উপজেলা কমিটিতে সাবেক জামায়াত নেতা নুরুল আমিনসহ স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের লোকজনদের পদ দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি।
সংক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক কমিটিসহ স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বুধবার সালাম রাঢ়ী এবং সাবুর নেতৃত্বে ৫ শতাধিক নেতাকর্মী এমপি সরোয়ারের বাসায় গেলেও তাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে শেষে রাত সোয়া ১০টার দিকে সাক্ষাৎ না দিয়ে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। জনপ্রতিনিধির এই রাজনীতিবিমুখ আচরণে কর্মী-সমর্থকেরা তিক্ত-বিরক্ত, এমনকি হতাশও হয়েছেন বটে।
অনুরূপ মন্তব্য করেছেন প্রবীণ রাজনৈতিক সাবেক চেয়ারম্যান সালাম রাঢ়ী এবং জিয়াউল ইসলাম সাবু। নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, একজন এমপির কাছ থেকে সাধারণ মানুষ বা কর্মীরা এমনটা আশা করেন না। মজিবর রহমান সরোয়ার যে কাজটি করেছেন বা করছেন তা নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ এবং অসন্তোস তৈরি হচ্ছে। তার বাসায় সরকারি কর্মকর্তা বা সাধারণ মানুষ গিয়ে ইজ্জত নিয়ে ফেরা দায় হয়ে পড়েছে।
এর আগে মাস দুয়েক আগে বরিশাল জেলাপর্যায়ের একজন সরকারি কর্মকর্তা এমপির সাথে বাসায় কথা বলতে গিয়ে ব্যাপক হেনস্থা হন। এমপি সরোয়ারের উপস্থিতিতে সেই কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করাসহ বেইজ্জতি করেন রিয়াজ ওরফে ডিম রিয়াজ নামের জনৈক ব্যক্তি। তখন সেখানে বরিশাল মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদ হাসান মামুন এবং শ্রমিক দলনেতা আক্তারুজ্জামান সাব্বিরসহ বেশ কজন উপস্থিত থাকলেও কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। সেই ঘটনার সাক্ষী বরিশালের একজন সাংবাদিক। এমপির বাসার মন্দরমহলের এই নোংরা কীর্তিকলাপ শেষ পর্যন্ত আর চাপা থাকেনি। বরিশাল বিএনপির শীর্ষস্থানীয় সকল রাজনৈতিকেরা অবগত হন এবং দলের পক্ষ থেকে সাংবাদিকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, জনপ্রতিনিধিদের বাসায় গেলে বেইজ্জতি হওয়া নতুন কিছু নয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলের গত ১৭ বছরেও একই ধরনের বহু উদাহরণ আছে। কিন্তু নিজের দলের ৪০০/৫০০ নেতাকর্মীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে সাক্ষাৎ না করা একধরনের রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ার ইঙ্গিত বহন করছে। বরিশাল সদর আসনের মতো স্থানে কর্মী ধরে না রাখতে পারলে আগামীতে সরোয়ারকে এর মাশুল গুনতে হতে পারে।
সাক্ষাতে ব্যর্থ তৃণমূল ক্ষোভে ফুঁসছেন— এই প্রাসঙ্গিক বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সরোয়ারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। তবে ঘনিষ্ট বেশ কজন নামপ্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বুধবার যারা এমপির বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ সদর উপজেলা বিএনপির কমিটিতে থাকলেও সিটি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এবং তারা কিছুদিন পূর্বে নুরুল আমিন-আব্বাসের কমিটি বাতিল চেয়ে কর্মসূচি পালন করেছিলেন, সম্ভবত এই কারণে ক্ষোভে এমপি সরোয়ার তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেননি।
বরিশাল সদর আসনের এমপির বাসার মন্দরমহলে কতিপয় লোকের যে আধিপত্য চলে তা নিয়ে খোদ কর্মী-সমর্থকদের বেকায়দায় আছেন। একাধিক কর্মী অভিযোগ করে বলছেন, সাব্বির-ডিম রিয়াজদের দাপটের কারণে এমপি সরোয়ারের বাসায় যাওয়া এবং তার সাথে কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গুটিকয়েক লোক জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে রাখে, ফলে সেখানে গিয়ে কেউ ইজ্জত নিয়ে ফিরতে পারছে না।
বরিশাল সদরের এমপির বাসায় গেলে যে ইজ্জত যায়— তা শীর্ষস্থানীয় বিএনপি নেতারাও স্বীকার করেন এবং এই বিষয়টি ইতিমধ্যে ঢাকায় হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান।’
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
নোনা জলের আগ্রাসন উপকূলের নদী থেকে গভীর নলকূপে
পদবঞ্চিত বিএনপি নেতাদের সাক্ষাৎ দিলেন না এম,পি সরোয়ার
ধুঁকছে বরিশালের একমাত্র হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র, শেবাচিমে রোগীর চাপ
বরিশালে মামলার ফাঁদে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার যানবাহন
এবার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হোলো মঈন আব্দুল্লাহ কে