সাংবাদিক রাহাত অস্ত্রধারী! লিটন বাশার
 সাংবাদিক রাহাত খান – ফাইল ফটো
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ও চ্যানেল-২৪ এর সাংবাদিক রাহাত খানের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার গৌরনদী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের অপ্রত্যাশিত কোন বড় খবর নয়। তবে এটা বড় খবর হওয়ার কারণ রয়েছে। কারণ এটা সংবাদ প্রকাশের জের ধরে করা মানহানির কোন মামলা নয়। এটা একজন অস্ত্রধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামী করার খবর।
বরিশালের উদীয়মান তরুন ও সাহসী সাংবাদিকদের অপ্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে রাহাতকে উপস্থাপন করলে কেউ অখুশী হতে পারেন, কিন্তু এটাই জ্বলন্ত সত্য এখন আমাদের সবার কাছে। রাহাত খানের সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ না হলেও ভাল বলা যাবে না। যে কারণেই হোক রাহাতের অপছন্দের তালিকার সাংবাদিকদের মধ্যে আমি একজন। তবুও তার পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেছি বহুবার প্রকাশ্যেই।
ঢাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে বরিশালে আসা প্রথম আলোর সাংবাদিক রাজীব নূর, এটিএন নিউজের বোরহান উল হক সম্রাট সহ বিভিন্ন জনের কাছেই রাহাতের সাংবাদিকতার প্রশংসা করেছি অকপটে। এমনকি বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফর সঙ্গী হয়ে আসা সাংবাদিকদের বহরের মাঝে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিনিয়র সাংবাদিক সহ ঢাকা থেকে আগত সাংবাদিকদের সামনেও রাহাত খানের সাহসী সাংবাদিকতার কথা বলছি অকপটে।
সত্য প্রকাশে সাহসী সাংবাদিকতায় রাহাতের ভূমিকার কথা হয়তো সকলেরই জানা। কিন্ত আমরা কেউ কি কখনো জেনেছি যে রাহাত একজন অস্ত্রধারী! সে গুলি করতে জানে! গুলি চালিয়ে আসলাম সিকদারের মত দুর্ধষ সন্ত্রাসী ডাকাত সর্দার সর্বহারা নেতাকে কাবু করে দিয়েছে! এরপর আসলাম সিকদার তাকে জাপটে ধরে ছিল কিন্ত রাহাতের শরীরে এতই শক্তি যে তাকে আসলাম বা তার ডাকাত বাহিনীর সদস্যরা ধরে রাখতে পারেনি! অবিশ্বাস্য এই গল্পটি শুক্রবার গৌরনদী থানায় রের্কড হওয়া মামলার এজাহার।
মামলার প্রধান আসামী রাহাত খান। এতদিন তাকে যারা সাহসী সাংবাদিক হিসাবে জানতো, তারা নতুন করে জানলেন সে অস্ত্র পরিচালনায় পারদর্শী! নতুন সাহসী সশস্ত্র খল নায়কের ভূমিকায় রাহাতের এ নতুন পরিচয়টি আবিস্কার করে দিলেন যারা, তারা সর্বদাই অস্ত্র নিয়ে খেলা করেন। এদের মধ্যে এক গ্রুপ আইনের পোশাকে অপর গ্রুপটি বে-আইনী অস্ত্র পরিচলানায় পারদর্শী। এই দুয়ে দুয়ে রাহাতের জীবনের চার শব্দটি শুক্রবার পূরণ হলো।
বয়স আমার কম হলেও দীর্ঘদিন এ পেশার সাথে যুক্ত থাকার কারণে জেনেছি বুঝেছি এখানে শত্রু তৈরী করতে হয় না, আগাছার মত খুব দ্রুত জন্মায়। রাহাতের ভাগ্য ভাল বলতে হবে। কারণ গৌরনদী থানায় তার বিরুদ্ধে যখন মামলাটি দায়ের করা হয় তখন আমার সেল ফোনটি বন্ধ ছিল। তা না হলে তার বিপদটি আরো ভয়াবহ রুপ নিতে পারতো। অভিজ্ঞতার কারণ হিসাবেই বলছি কথাটা।
বেশী দিন আগের কথা নয়, মাত্র এক মাস আগের ঘটনা। রাত ১২টার দিকে রাহাত আমাকে ফোন করলো। তার কয়েক জন নিরীহ বন্ধুকে কাউনিয়া থানা পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। যদি বলে কয়ে অনুনয় বিনয় করে নির্দোষ ছেলেগুলোকে মুক্ত করা যায় তাহলে তাঁর সম্মান বাঁচে। আমি বুঝলাম, রাহাত এত সাংবাদিকদের মধ্যে পুলিশের কাছের সাংবাদিক হিসাবেই হয়তো আমাকে বেছে নিয়েছে। পুলিশ যদি সাংবাদিকদের মধ্যে কারো কথা শোনে তাহলে হয়তো লিটন বাশারের কথাই শুনবে, কারণে- অকারণে পুলিশের পক্ষে ২/১ টি ইতিবাচক খবর তুলে ধরতে আমি প্রায়ই সাংবাদিকদের অনুরোধ করি – তাই তাদের এটুকু সামান্য দাবি থাকাটাই স্বাভাবিক। কিছুটা বিব্রত হলেও সেই রাত ১২ টায় পুলিশের এক কর্তাকে আপন মনে করেই ফোন করলাম। আল্লাহর অসীম রহমত বলতে হয় তিনি ফোনটি ঐ রাতে রিসিভ করলেন না। একটু পরই রাহাত ফোন করে জানালো ‘আপনার আর কোথাও ফোন করার দরকার নেই। টাকা পয়সার একটা লাইনে কথা হয়েছে। অন্য মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছি ওদের ছেড়ে দেবে এখনই।’
আমি আল্লাহর কাছে আরো একবার শুকরিয়া আদায় করলাম। আমাদের কোন প্রিয় পুলিশ কর্মকর্তাকে সেই রাতে ফোন করলে হয়তো রাহাতের বন্ধুরা সেই রাতে ছাড়া পাওয়া তো দূরের কথা পরদিন একে-৪৭ সহ আদালতে সোপর্দ হতো। আল্লাহ পাকের কাছে লাখো শুকরিয়া সেই রাতে কিছু টাকা কাউনিয়া থানার ওসিকে ধরিয়ে দিলেও ভালোয় ভালোয় রাহাতের বন্ধুরা রাতেই বাসায় ফিরে ঘুমালো।
কিন্ত গতকাল রাহাতের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার যে খবরটি পেলাম তা খুবই ভয়ংকর বিপজ্জনক মনে হলো। মামলাটির বাদী নিষিদ্ধ ঘোষিত সর্বহারা দলের শীর্ষ নেতা। তার বিরুদ্ধে খুন ডাকাতি সহ অপরাধ কর্মকান্ডের শেষ নেই। সেই অপরাধী মামলার বাদী আর আসামী রাহাতের মত একজন পেশাদার সাংবাদিক ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আগরপুর ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিমু।
পুলিশের সরাসরি সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের মামলা থানায় রের্কড হওয়ার নজির বাংলাদেশে খুবই কম। যতটুকু প্রাথমিকভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি তাতে ওয়ান ইলেভেনের পর যে সব সর্বহারা সদস্যরা এলাকাছাড়া হয়েছিল তারা গত ইউপি নির্বাচনের আগেই আবার এলাকায় ফিরেছে। সেই উত্তরা থানা পুলিশের অস্ত্র লুট যারা করেছিল, তারা ফিরেছে নিজের এলাকায়।
আমাদের বরিশাল অঞ্চলের সর্বহারা অধ্যুষিত এলাকা গুলো সম্পর্কে সকলেই ওয়াকিবহাল রয়েছেন। সেই কীর্তনখোলা নদীর তীর ঘেষে লামছরি, চরবাড়িয়া, তালতলী, সাপানিয়া, নাপিতের হাট থেকে শুরু করে কাউনিয়া থানার পর বিমানবন্দর থানার চাদপাশা ও বাবুগঞ্জ হয়ে সরিকল, গৌরনদী এবং কালকিনি সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। কমপক্ষে ৪/৫ টি থানায় গত ইউপি নির্বাচন থেকেই এরা নানান লেবাসে সক্রিয়। রাতে ডাকাতি ও চুরি, দিনে নানান রাজনৈতিক দলের হয়ে এদের বিচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
পুলিশ যেহেতু তাদের পৃষ্টপোষকতা দিচ্ছে সেখানে রাহাত খান এই সর্বহারাদের সম্পর্কে নিজের পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি প্রথম আলো ও ইনডেপেনডেন্ট টিভিতে তার পিতার হত্যকারী সর্বহারাদের সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন সেই ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সর্বহারা সদস্যরা এ অঞ্চলে যে রক্তের হলিখেলায় মেতে উঠেছিল তারা এখন রাজনৈতিক লেবাসে কিভাবে সক্রিয়। হয়তো গণমাধ্যমে এ সব ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশিত হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল। তাই ডাকাতির মালামাল ভাগাভাগি নিয়ে যখন গোলাগুলি হল তখনই সন্ত্রাসী ও পুলিশের শত্রু হিসাবে রাহাতকে দাড় করিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হলো।
অংকের এ হিসাবটা খুব সহজে বুঝলেও বরিশালের ডিআইজি এবং পুলিশ সুপার সাহেবের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল একটু আলাদা। কারণ সব পুলিশই খারাপ, সব পুলিশই সর্বহারা সন্ত্রাসী লালন-পালন করে এটা আমরা বিশ্বাস করি না। কারণ আমাদের সেই বিশ্বাসে চিড় ধরিয়ে পুলিশ যে জনগনের সেবক সেই বাস্তবতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেছেন এই রেঞ্জের এক সময়ের ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও পুলিশ কমিশনার এম আকবর আলী, সৈয়দ তৌফিক আহমেদ। এমনকি বর্তমান পুলিশ সুপারের চেয়ারে মাত্র কয়েক বছর আগে যিনি বসেছিলেন সেই পুলিশ সুপার তওফিক মাহবুব চৌধুরীর কথা চিন্তা করলেও বরিশালের মানুষ হয়তো আজকের বাস্তবতার কোন মিল খুঁজে পাবেন না।
মামলা রের্কড হওয়ার পর জানি কিছু করার নেই, তবুও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই বর্তমান পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহকে ফোন করেছিলাম। তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। কি কারণে রিসিভ করেননি তা জানি না। তবে শুধু বলতে চেয়েছিলাম ‘আপনার বিরুদ্ধেও তো কত লিখিত অভিযোগ আমাদের প্রেসক্লাবে এসেছে। গোয়েন্দা সংস্থা তা তদন্তও করেছে। জানি না তারা তদন্ত করে সত্য মিথ্যা কি প্রতিবেদন আপনার সম্পর্কে সরকারকে দিয়েছে কিন্ত আমরা ব্যক্তিগতভাবে ধারণা করেছি আপনার সম্পর্কে যে সব অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল ততটা নীচে নেমে এত খারাপ কাজ আপনি করতে পারেন না। আপনাকে একবার ভূলেও বলিনি আপনার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কারা দিচ্ছে। তাতে আপনি হয়তো লজ্জা পাবেন এবং বিব্রত বোধ করবেন। কিন্ত আপনার কি একবারও বিবেক সায় দিল না যে রাহাত বরিশাল থেকে ঐ রাতে গিয়ে আসলাম সিকদারকে গুলি করতে পারে কি না? রাহাত সেই রাতে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে কোথায় ছিল তা একটু সামান্য খোঁজ নিলেই আপনি জানতে পারবেন। আমরা যখন আপনাদের এত সম্মান ও বিবেকের স্থানটিতে বসিয়ে রাখি তখন যদি প্রতিটি পদে পদে আপনারা আমাদের হয়রানী করতেই থাকেন তাহলে কি আর আমাদের আগামীর পথচলা পূর্বের ন্যায় অভিন্ন ভাবে অটুট থাকবে! আমাদের পেশাগত দায়িত্ব ভুলে গিয়েও আমরা যদি একটি সুখী সুন্দর শান্তির বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি – তা কি এ ধরনের মামলার মধ্য দিয়ে অর্জন করা সম্ভব হবে নাকি অন্তরায় সৃষ্টি করবে। সেটুকু ভেবে দেখার জন্যই ফোন করেছিলাম।’ আর পাঠকদের ভাবনার জন্য তুলে ধরলাম।
লেখক: লিটন বাশার, সাধারন সম্পাদক, বরিশাল প্রেসক্লাব।
|