ওদের ৪ জনের শিক্ষায় আলোকিত হচ্ছে আবাসনের শিশুরা
 ঝালকাঠির কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্পের ছিন্নমূল শিশুদের পাঠশালা (ছবিঃ আমাদের বরিশাল ডটকম)
জিয়াউল হাসান পলাশ, ঝালকাঠি :: ‘আমরাও আবাসনের মেয়ে। গরীব বলে অনেক সংগ্রাম অভাব অনটনের মধ্যে থেকেও লেখাপড়া করছি। বুঝতে পারছি পড়া লেখার আলোকিত জীবন কিছুটা হলেও সুখের। আর ওরা এখন ফুলের মতই। আমাদেরই ভাইবোন। ওদেরকে আমরা অন্ধকারে রাখতে পারিনা। তাই কোন পারিশ্রমিক ছাড়াই এ ফুলগুলোকে ফুটিয়ে একটু ঘ্রান ছড়াতে পারলেই আমাদের পরিশ্রম স্বার্থক হবে।’ নিজেদের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে একথা বলেন ঝালকাঠির কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্পের ছিন্নমূল শিশুদের শিক্ষক অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী পারুল বেগম।
ঝালকাঠির গাবখান, ধানসিড়ি ও সুগন্ধা নদীর মোহনা ঘেষে কাটপট্টির খাল প্রবাহিত। ঝালকাঠি থেকে খালটির খেয়া পাড় হয়ে ওপাড় উঠে কিছুদূর হেটে এলেই লবন মিলের পাশ দিয়েই কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্পের রাস্তা। এ রাস্তা দিয়ে হেটে এসে বায়ে একটু এগুলেই আবাসন কমিউনিটি সেন্টার। এখানে আবাসনের বিয়ে, সমিতির সভাসহ বিভিন্ন কাজ পরিচালিত হয়। আর এ সেন্টারের একমাত্র রুমটিই এখন অস্থায়ী বিদ্যালয় হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে। বাহির থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এর ভিতরে আবাসনের ছিন্নমূল শিশুদের লেখাপড়া শিখানো হয়। তবে হাতে লেখা একটি সাইনবোর্ড এবং জাতীয় পতাকাটি দেখে কিছুটা আঁচ করা সম্ভব।
সিডরে ক্ষতিগ্রস্থ এ সেন্টারের টিন এখনো পাল্টানো হয়নি। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই ভিতরে পানিতে ভরে যায় । তখন লেখাপড়া বন্ধ রাখতে হয় বাধ্য হয়েই। ২০০৭ সন থেকে এখানে একটি রুমের ভিতরেই ভাগ করে কয়েক শ’ শিশুকে ১ম শ্রেনী থেকে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ানো হচ্ছে। এ রুমটিই যেন আবাসন শিশুদের ভাগ্য নির্ধারনের একটি পবিত্র স্থান। এখানে যে চার জন মেয়ে ওদের বিনা পারিশ্রমিকে এ শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছে তারাও এ আবাসনেরই মেয়ে। এরা হলো বরিশাল বিএম কলেজের অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্রী পারুল বেগম, এইচএসসির ছাত্রী মনি আক্তার, বিএ’র ছাত্রী মুক্তা খানম, এসএসসি পাশ রেশমা আক্তার নাসরিন।
এখানের শিক্ষক মুক্তা খানম জানান, ‘আমরাও এ আবাসনের মেয়ে। অনেক কষ্ট করে একটু পড়ালেখা করতে পারায় বুঝতে পেরেছি এর প্রয়োজনীয়তা জীবনে কত বেশী। তাই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি ওদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সামান্য হলেও কিছু করার। প্রথমে আমরা এখানকার ১৬৭ শিশুকে নিয়ে শুরু করি। আর বর্তমানে প্রায় ২শ’ শিশু শিক্ষার্থী এখানে পড়ছে।’
এখানে শিক্ষাদানকারি পারুল বেগম, মনি আক্তার, রেশমা আক্তার জানান, আবাসনের কমিউনিটি সেন্টারে নির্মিত এ রুমেই ২ শিফটে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। শুরুতে এখানে পাটিতে বসে ব্লাকবোর্ড ছাড়াই শিশুদের পড়ানো হতো। সিডরের পর কিছু বিদেশী এখানে আসলে তাদের আর্থিক সহযোগীতায় আবাসন সমবায় সমিতির সভাপতি আমাদের কয়েকটি বেঞ্চ তৈরী করে দেয়। আর একটি ভাঙ্গা ব্লাকবোর্ড যোগার করা হয়েছে। এসব দিয়েই আমাদের ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছি।
শিশুদের পড়া লেখার খরচ কারা বহন করে জানতে চাইলে তারা বলেন, আবাসনের এখানে পরতে আসা সকল শিক্ষার্থীই গরিব। আমাদের চারজনের মত বেশিরভাগ শিশুর মা-বাবা দিনমজুর। ওদের বইখাতা কেনার সামর্থ নেই। তাই আমাদের টিউশনির টাকা দিয়ে পুরোনো বই এবং খাতা কেচি দরে কিনে এনে এখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সরকারীভাবে কেউ আপনাদের সাথে যোগাযোগ অথবা সাহায্য করেছে কিনা জানতে চাইলে তারা জানান, আজ পর্যন্ত সরকারীভাবে এ বিদ্যালয়ে কোন বই বা আর্থিক সহযোগীতা পাইনি। আশেপাশের কিছু স্বচ্ছল ব্যাক্তি মাঝে মাঝে শিশুদের বই-খাতা কেনার জন্য কিছু সাহায্য দেন কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় নগন্য।
এ সেচ্চাশ্রমের স্কুলের ব্যাপারে জানতে চাইলে উত্তর কিস্থাকাঠি আবাসন প্রকল্প সমবায় সমিতির সভাপতি নুরু হাওলাদার জানান, ‘ওরা যদি এ উদ্যোগ না নিত তাহলে আবাসনের এ শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকত। আমরা ওদের কোন পারিশ্রমিক দিতে পারিনা আর ওদের সরকারী বা বেসরকারিভাবে তেমন কোন সাহায্য সহযোগীতাও এনে দিতে পারিনি। সবাই শুধু আশ্বাস দেয়। তারপরেও ওরা ছিন্নমূল এসব শিশুদের জন্য কমিউনিটি সেন্টারে পড়াশুনা চালু রেখেছে। ওদের মাধ্যমে আবাসনের গরীব অসহায় শিশুরা শিক্ষার আলো আলোকিত হবে এ প্রত্যাশা করছি। ওদের এই চলার পথে যদি কোন স্বচ্ছল ব্যাক্তি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয় সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
–
(আমাদের বরিশাল ডটকম/ঝালকাঠি/জিহা/তাপা)
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |