Current Bangladesh Time
Thursday May ২১, ২০২৬ ১০:৫৩ PM
Barisal News
Latest News
Home » নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) » পিরোজপুর » দুর্ভিক্ষের আবিষ্কার: স্বরূপকাঠিতে মাটি সিদ্ধ করে লবণ
২১ May ২০২৬ Thursday ১:৪০:১১ PM
Print this E-mail this

দুর্ভিক্ষের আবিষ্কার: স্বরূপকাঠিতে মাটি সিদ্ধ করে লবণ


নেছারাবাদ ((পিরোজপুর) প্রতিনিধি:

সাগরপারের বিস্তীর্ণ মাঠ। যেখানে জমিতে থাকা লোনাপানি সূর্যের তাপে শুকিয়ে হয়ে ওঠে সাদা লবণ। শ্রমিকরা সেই লবণ তুলে স্তূপ করেন মাঠের পাশে। কক্সবাজার কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলের পরিচিত সেই দৃশ্যই যেন লবণচাষের চেনা গল্প। কিন্তু পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার ডুবি গ্রামে গিয়ে সেই ধারণা বদলে যায়। সাগর নেই, উপকূলও নেই, তবু এখানে তৈরি হচ্ছে লবণ। তাও আবার কোনো আধুনিক প্রযুক্তিতে নয়, প্রায় অর্ধশত বছরের পুরোনো এক পদ্ধতিতে। পরিত্যক্ত লবণমিশ্রিত মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে তা আগুনে সিদ্ধ করে তৈরি হচ্ছে ঝরঝরে সাদা লবণ।

পিরোজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরের ডুবি গ্রামের এই লবণশিল্পের পেছনে রয়েছে এক মর্মস্পর্শী গল্প। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় দেশে দেখা দেয় লবণের তীব্র সংকট। সেই সময় ঝালকাঠির লবণ পরিশোধন কারখানার আশপাশের লবণমিশ্রিত পরিত্যক্ত মাটি সংগ্রহ করে তাতে পানি মিশিয়ে আগুনে জ্বাল দিয়ে লবণ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের পথিকৃৎ ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর ফরাজী।

নেছারাবাদের (স্বরূপকাঠি) পাশেই বাণিজ্যনগরী ঝালকাঠি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই সেখানে লবণ পরিশোধনের কারখানা ছিল। দুর্ভিক্ষের সময় যখন লবণ পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে, তখন ডুবি গ্রামের আবু বক্কর ফরাজী ছুটে যান ঝালকাঠিতে। সেখানকার কারখানার আশপাশের মাটি সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে রেখে দেন। পরে পানিতে লবণের ঘনত্ব তৈরি হলে তা আগুনে ফুটিয়ে তৈরি করেন লবণ। শুরুটা ছিল কেবল পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য। কিন্তু বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় এলে এলাকার মানুষও আগ্রহী হয়ে ওঠেন এই পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনে।

১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে লবণ উৎপাদনের মিল স্থাপন করেন আবু বক্কর ফরাজী। তার দেখাদেখি ডুবি গ্রামের আরও কয়েকজন লবণ উৎপাদনে যুক্ত হন। পরে পাশের সোহাগদল, সারেংকাঠি, এমনকি বরিশালের বানারীপাড়া ও উজিরপুরের কিছু পরিবারও একই পদ্ধতিতে লবণ তৈরি শুরু করে।

এই লবণ তৈরির কারিগর আবু বক্কর বর্তমানে আর বেঁচে নেই। তার শুরু করা ব্যবসা এখন পরিচালনা করছেন ভাই আবুল হোসেন ফরাজী। তিনি বলেন, ‘ভাই প্রথম মাটি দিয়ে ঝরঝরে লবণ তৈরি করেছিলেন। প্রথমে গ্রামের মানুষের চাহিদা মিটত। পরে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হলে একে একে অনেকে এই শিল্পে আসেন।’

অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও ডুবি গ্রামের লবণশিল্প এখনো টিকে আছে। বর্তমানে অন্তত ১১ জন ব্যবসায়ীর ২০টি কারখানায় চলছে লবণ উৎপাদন। এসব কারখানায় রয়েছে প্রায় অর্ধশত চুলা। স্থানীয়দের মতে, প্রতিমাসে প্রায় ৩২০ টন লবণ উৎপাদন হয়। শুধু উৎপাদন নয়, এ শিল্পকে ঘিরে জীবিকা গড়ে উঠেছে বহু মানুষের। প্রায় ৫০০ পরিবার কোনো-না-কোনোভাবে জড়িত এ কাজের সঙ্গে। কেউ মাটি বহন করেন, কেউ পানি ছেঁকে পরিষ্কার করেন, কেউ আবার চুল্লির আগুন সামলান ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

লবণ তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিও বেশ ব্যতিক্রমী। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা ঝালকাঠির লবণ পরিশোধন কারখানা থেকে লবণমিশ্রিত পরিত্যক্ত মাটি ডুবি গ্রামে আনা হয়। বড় বড় স্তূপ করে সেই মাটি সংরক্ষণ করা হয়। এরপর মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে গলানো হয়। কয়েক ধাপে উপরের ময়লা অপসারণ করে আলাদা করা হয় লবণাক্ত পানি। সেই পানি পরে চুল্লির ওপর রাখা চারকোনা ডোঙ্গায় ঢেলে তীব্র আগুনে ফোটানো হয়। প্রায় সাত ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। শেষে ডোঙ্গার তলায় পড়ে থাকে সাদা ঝরঝরে লবণ।

লবণ তৈরির কারিগররা বলছেন, দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়ায় লবণ জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়। পরে মেশিনের মাধ্যমে আয়োডিন মিশিয়ে বাজারজাত করা হয় খাবার লবণ হিসাবে। শিল্পকারখানায়ও ব্যবহার হয় এ লবণের একটি অংশ।

ডুবি গ্রামের মনির হোসেন প্রায় ২৫ বছর এ পেশায় আছেন। প্রতিদিন চুল্লির আগুন, ধোঁয়া আর তাপের মধ্যে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দুইজনে মিলে দিনে প্রায় ৩০ মন লবণ তৈরি করি। এতে গড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা আয় হয়। আগুনে জ্বাল দেওয়ার কারণে লবণ ভালো থাকে। পরে আয়োডিন মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করি।’

একসময় এ শিল্পের ব্যাপক চাহিদা ছিল বলে জানান ব্যবসায়ীরা। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বানারীপাড়ার একটি বাজারে সপ্তাহে দুইদিন প্রায় দেড় হাজার মন লবণ বিক্রি হতো। ডুবি গ্রামের পদ্ধতি অনুসরণ করে ঢাকা, কক্সবাজারের পটিয়া ও নারায়ণগঞ্জেও গড়ে উঠেছিল লবণ উৎপাদনের কারখানা। তবে গ্যাস সংকটসহ নানা কারণে সেসব কারখানার বেশির ভাগ এখন বন্ধ।

মেসার্স সোনালী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক সেলিম মিয়া বলেন, আমার কারখানায় আয়োডিন মেশানোর মেশিন রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন শ্রমিক এখানে কাজ করেন। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ নেই।’

ডুবি গ্রামের মানুষ শুধু লবণ উৎপাদন বা বিক্রি করছেন না। ধরে রেখেছেন দুর্ভিক্ষের সময় বেঁচে থাকার তাগিদে জন্ম নেওয়া এক প্রাচীন শিল্পের ইতিহাস।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
আগামী ৬ জুন শেবাচিমে চালু হবে হেমাটোলজি ডে কেয়ার ইউনিট
আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ সহ ৪ জনের বিচার শুরু
শেবাচিম হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু ঘিরে স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সংঘর্ষ
বগায় ‘স্বপ্নের সেতু’ নির্মাণ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গিয়ে অবরুদ্ধ সেতুমন্ত্রী
হামের চাপে শেবাচিম ও জেনারেল হাসপাতাল, রোগী ধরে রাখতে পারছে না উপজেলা হাসপাতাল
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com