১৯৭১ সালের ১৩ জুনের আকাশটা ভোর থেকেই থমথমে মেঘে ঢাকা ছিল। নীলফামারীর সৈয়দপুরের বুকে সেদিন সকাল থেকে যে ঝিরঝির বৃষ্টি নামল, তা যেন কোনো সাধারণ আষাঢ়ে বর্ষণ ছিল না, বরং তা ছিল উত্তরবঙ্গের এই প্রাচীন রেলশহরের বুকে আসন্ন এক মহাপ্রলয়ের রক্তিম উপক্রমণিকা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের বহু আগে, মূলত ব্রিটিশ আমলে ভারতের রাজস্থান, মারওয়ার, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের এই বৃহৎ জংশন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে এসে স্থায়ী বসতি গেড়েছিলেন মারওয়াড়ি ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। সুদীর্ঘকাল ধরে তাঁরা এ দেশের জল-হাওয়াকে ভালোবেসে, শহরের জুট প্রেসিং ও নানা ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে হয়ে উঠেছিলেন খাঁটি সৈয়দপুরী। মারওয়াড়ি সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক তুলসীরাম আগরওয়ালা ১৯১১ সালেই এখানে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘তুলসীরাম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’। কিন্তু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই এই অবাঙালি অধ্যুষিত চেনা শহরটায় এক চরম মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে। চারদিকে এক যুদ্ধংদেহী পরিবেশ তৈরি করে স্থানীয় উগ্র বিহারিরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ ইন্ধনে বাঙালিদের ওপর চড়াও হতে শুরু করে। একাত্তরের মার্চে পুরো সৈয়দপুর শহরটিকে এক বধ্যভূমিতে পরিণত করা হয়, যার প্রতিটি ঘরের উঠোন ছিল এক একটি মৃত্যুকূপ। ২৫ মার্চের কালরাতের পর থেকে পুরো মারওয়াড়িপট্টি, ধাঙড়িপট্টি, নয়াটোলা ও গুয়াটিয়া এলাকা অবরুদ্ধ কারাগারে রূপ নেয়।এই বন্দী মানুষদের বাধ্য করা হতো সৈয়দপুর বিমানবন্দরের (তৎকালীন জমজম বিমানবন্দর) সামরিক সম্প্রসারণ ও রানওয়ে শক্তিশালীকরণের কাজে ক্রীতদাসের মতো খাটতে। স্থানীয় প্রভাবশালী মতিন হাশমী ও কাইয়ুম খানের চাবুকের নিচে অবরুদ্ধ মুক্তিকামী বাঙালিদের অমানুষিক দাসশ্রম আর রক্তের বিনিময়েই মূলত একাত্তরের মে মাসে জোরদার হয়েছিল এই বিমানবন্দরের সামরিক ঘাঁটি।
অবরুদ্ধ এই জনপদের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার চূড়ান্ত নীল নকশা সাজানো হয় মে মাসের শেষে এবং জুনের ৫ তারিখে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে। এর আগে ১২ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৬ নম্বর ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফের নেতৃত্বে তুলসীরাম আগরওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া, রামেশ্বর লাল আগরওয়ালা, বদ্রীপ্রসাদ আগরওয়ালা, কমল চন্দ্র জেন এবং জগদীশ প্রসাদ সরাফসহ বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে চোখ বেঁধে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় রংপুর সেনানিবাসের অদূরে নিসবেতগঞ্জের ঘাঘট নদীর তীরের বধ্যভূমিতে। সেখানে তাঁদের নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। এই শীর্ষ নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী সমাজকে হারানোর পর পুরো মারওয়াড়িপট্টিতে নেমে আসে শ্মশানের নীরবতা। বাড়ি বাড়ি তখন বিহারিদের লাগামহীন লুটতরাজ ও পাশবিক নির্যাতন। এমন নিদারুণ আতঙ্কের মাঝে ৫ জুন পাকিস্তানি কমান্ডারেরা এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ পাতে, যার সামরিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন খরচাখাতা’। সৈয়দপুর সেনানিবাসের সামরিক কো-অর্ডিনেটর মেজর জহুর আহমেদের নির্দেশে স্থানীয় শান্তি কমিটির নেতা ইজাহার আহমেদ, কাইয়ুম খান ও ওয়ানিস আহমদের প্ররোচনা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনায় শহরে মাইকিং করা হয়: “যারা হিন্দু ও মারওয়াড়ি আছেন, তাঁদের সসম্মানে বিশেষ ট্রেনে ভারতের হলদিবাড়ি ও চিলাহাটি সীমান্ত পার করে দেওয়া হবে।” অবরুদ্ধ ও সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো এই উদ্ধার ট্রেনকে মুক্তির আলো মনে করে ঘরের অবশিষ্ট সোনাদানা ও নগদ টাকা ঘাতকদের হাতে ‘নিরাপত্তা ট্যাক্স’ ও টিকিটের চড়া মূল্য হিসেবে তুলে দেন।
১২ জুন রাত থেকেই সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটর্মে উপচে পড়ে প্রায় পাঁচশ’ হিন্দু মারওয়ারি ও বাঙালি মানুষের আকুল ভিড়। ১৩ জুন সকাল ১০টায় যখন বিশেষ চিলাহাটিগামী ট্রেনটি এসে দাঁড়ায়, তখন মুক্তির আনন্দে সবাই বগিতে উঠে পড়েন। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে প্ল্যাটফর্মে নেমে আসে এক চরম নির্মমতা। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বগিগুলো থেকে বেছে বেছে কমপক্ষে ২০ জন মারওয়ারি তরুণীকে জোরপূর্বক নামিয়ে নেয়। স্বজনদের আকুল আর্তনাদকে বুটের তলায় পিষে দিয়ে সেই ২০ জন বোনকে মিলিটারি জিপে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সৈয়দপুর ক্যন্টনমেন্টের অন্ধকার নরকে। এরপর ট্রেনটি যখন স্টেশন ছাড়ে, ঠিক তখনই ভেতরের বাতিগুলো নিভিয়ে সব জানালা ও দরজা বাইরে থেকে লোহার হুড়কো দিয়ে আটকে লক করে দেওয়া হয়। ট্রেনটি অত্যন্ত ধীরগতিতে শহর পেরিয়ে, সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনের ঠিক দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, বর্তমান নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত কয়াগোলাহাটের কাছে গোলাহাট রেলওয়ে ব্রিজের (কালভার্ট) ওপর হেঁচকা টানে হঠাৎ থেমে যায়।
ট্রেন থামার সাথে সাথেই চারদিক বৃত্তাকারে কর্ডন করে দাঁড়ায় ভারী মেশিনগান হাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য এবং ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস (ইপিসিএএফ)-এর জওয়ানেরা। আর বগির দরজা বাইরে থেকে খুলে ভেতরে দীর্ঘ রামদা, শানিত তলোয়ার, খঞ্জর আর বল্লম নিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে স্থানীয় বিহারি ঘাতক মহিউদ্দিন গুণ্ডা, হব্বু বিহারী, শুকুর কসাই, মিউনিসিপ্যালিটির পিয়ন মহিউদ্দিন, মেহেদী পানওয়ালা, ইসমাইল ও ফরহাদ টেইলার্সসহ শত শত উন্মত্ত অবাঙালি। বাতাসে গমগম করে ওঠে উর্দুতে দেওয়া সেই নির্দেশ—””উতরো নিচে! হাম তুমহে মারনে আয়ে হ্যায়। এক এক গোলি কা বহুত কিমত হ্যায়, পাকিস্তান কা ইতনা কিমতি গোলি তুম লোগো পে বরবাদ নেহি করেঙ্গে।” (নিচে নেমে আসো, আমরা তোমাদের মারতে এসেছি। একটি গুলির অনেক দাম, পাকিস্তানের এত দামি গুলি তোমাদের পেছনে খরচ করা হবে না)। আক্রান্তদের অনেকেই ঘাতকদের পূর্বপরিচিত ছিল। গতকাল পর্যন্ত যে দর্জির দোকান থেকে জামা বানানো হয়েছে, কিংবা যে পিয়নকে চিরকাল চেনা গেছে—রাতভরের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরে তারা আজ উল্লাসে ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছে। মৃত্যুর পূর্বে চেনা প্রতিবেশীদের হাত-পা ধরে অনুনয়-বিনয় করলেও ঘাতকদের মন গলেনি। চরম নিষ্ঠুরতায় তলোয়ার দিয়ে ধড় থেকে মাথা আলাদা করে একে একে মানুষের গলা কাটা হতে থাকে। শিশুদের দুই পা ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছিল, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের পেট চিরে ফেলা হচ্ছিল ধারালো রামদা দিয়ে। যারা জীবন বাঁচানোর জন্য ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়েছিল, তাদের মেশিনগান দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৪৪৭ থেকে ৪৫০ জন নিরীহ মানুষকে কুচিকাটা করে মেটানো হয় ঘাতকদের রক্তের তৃষ্ণা। মুহূর্তেই গোলাহাটের সেই কালভার্ট ও চারপাশের ধানক্ষেত পরিণত হয়েছিল ছিন্নভিন্ন লাশের এক মহাসমুদ্রে। রক্তে ভেসে গিয়েছিল মারওয়াড়িপট্টির যমুনা প্রসাদ, শান্তি দেবী, দ্বারকা প্রসাদ, ললিত কুমার, দিলীপ কুমার, সলিল কুমার, মুন্না, প্রদীপ কুমার আগরওয়ালা, সুমিত্রা দেবী, উষা আগরওয়ালা, সুনীতা, রিতা, রামেশ্বরলাল আগরওয়ালা, পুরুষোত্তমলাল আগরওয়ালা, বিমল কুমার আগরওয়ালা, মুরলীধর আগরওয়ালা, দুর্গাপ্রসাদ আগরওয়ালা, নিতা কুমারী, রাজেশ কুমার আগরওয়ালা, পুষ্প দেবী, মাঙ্গিলাল আগরওয়ালা, সরোজ দেবী, রঞ্জিত কুমার, মানিক কুমার, তিলোক কুমার, কিশোর কুমার, রাধাকৃষ্ণ, দামোদর প্রসাদ, গোদাবরী দেবী, চন্দা দেবী, ললিতা দেবী, রাজকুমারী দেবী, শহীদ পুনমচাঁদ কেডিয়া, চাপলা প্রসাদ কেডিয়া, সুরেশ কেডিয়া, মিতা কেডিয়া, লক্ষ্মী আগরওয়ালা, অশোক আগরওয়ালা, লীলা আগরওয়ালা, মোহন লাল ঘোষ, পুষ্প রাণী ঘোষ ও কার্তিক ঘোষদের নিথর দেহ। সেই অবর্ণনীয় লাশের পাহাড়ের ভেতর থেকে অলৌকিকভাবে ট্রেনের উল্টো দিকের দরজা ভেঙে, ঝুম বৃষ্টির সুযোগে পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন মাত্র ১০ থেকে ১২ জন তরুণ; যাঁদের মধ্যে অন্যতম তপন কুমার দাস, গোবিন্দ চন্দ্র দাস, বিনোদ কুমার ও প্রমোদ কুমার আগরওয়াল। চোখের সামনে পুরো পরিবারকে কাটা পড়তে দেখে নিজে বেঁচে যাওয়ার এই তীব্র ট্রমা বুকে নিয়ে তাঁরা আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন এক নিদারুণ মানসিক ক্ষত।
আজ সেই অভিশপ্ত ১৩ জুন, সৈয়দপুরের কুখ্যাত গোলাহাট গণহত্যা দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে নাৎসি বাহিনীর পৈশাচিকতার কথা বিশ্ববাসী জানে, কারণ তা বহুল প্রচারিত এবং সেখানে সুরক্ষার জন্য ‘Denial Law’ বা অস্বীকার বিরোধী আইন রয়েছে। কিন্তু জন্মভূমি বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের সেবাদাসেরা যা করেছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে নাৎসি বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় ইতিহাসবিদদের সুনির্দিষ্ট দালিলিক অনুসন্ধানে এই শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস আজ এক চিরন্তন সত্য। প্রতি বছর যখন এই দিনটি ফিরে আসে, তখন গোলাহাটের কালভার্ট আর রেললাইনের প্রতিটি ধূলিকণা যেন শহীদদের রক্তের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে। আজ এই রক্তস্নাত গণহত্যা দিবস ও ঐতিহাসিক দালিলিক সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে সমস্ত শহীদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা আর হৃদয়ের গভীর থেকে শাণিত চেতনা। আমরা যেন কখনোই ভুলে না যাই আমাদের স্বাধীনতার এই লাল পাণ্ডুলিপি কতটা রক্তমূল্যে কেনা।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বাজেটে বরিশালে বাণিজ্যিক উন্নয়নের দাবি
দখল আর অপরিকল্পিত নগরায়ণে হারিয়ে যাচ্ছে বরিশাল নগরীর ১৭ খাল
বন্ধ হয়ে গেল অলিম্পিক সিমেন্ট কারখানা, বিপাকে শ্রমিকেরা
বরিশাল সিটি নির্বাচন: জামায়াতের প্রার্থী হেলাল, থাকছেন না ফয়জুল