Home » পিরোজপুর » ভান্ডারিয়া » দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে জাতীয় দলে খেলতে চায় ভান্ডারিয়ার নাদিরা
২৫ June ২০২৬ Thursday ১:২০:১৯ PM
দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে জাতীয় দলে খেলতে চায় ভান্ডারিয়ার নাদিরা
ভান্ডারিয়া ((পিরোজপুর) প্রতিনিধি:
দিনমজুর বাবার সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী, কিন্তু মাঠে নামলেই নাদিরা হয়ে ওঠে এক দুর্দান্ত লড়াকু ফুটবলার। পায়ের জাদুতে গোল হয়, দল জেতে, আর দর্শক মুগ্ধ হয় তার ফুটবল খেলা দেখে।
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার উত্তর পৈকখালীর কিশোরী নাদিরা আক্তার। দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে জাতীয় দলে খেলতে চায় সে। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে কেবল একটি ত্রাণের ঘর। তবু সেই ঘরে অভাবের সংসারে লুকিয়ে আছে বড় এক স্বপ্ন। সংগ্রাম আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছে নাদিরা। ফুটবলই যেন বদলে দিয়েছে তার জীবনের গল্প।
সম্প্রতি পিরোজপুরে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর জেলা পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে সবার নজর কাড়ে ফুটবলার নাদিরা। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতির পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিতেছে সে। এরপর বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে নিজের সেরা প্রমাণ করে ঢাকায় খেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। ভান্ডারিয়া উপজেলার ৭নং গৌরীপুর ইউনিয়নের উত্তর পৈকখালী গ্রামের মো. দুলাল আকন ও শাহিদা আক্তার দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় নাদিরা। নাদিরা বর্তমানে ভান্ডারিয়া মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা দিনমজুর হওয়ায় সংসারে অভাব লেগেই থাকে। বড় ভাই নাঈম অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে কাজে নেমেছেন। মেজ ভাই নাহিদ এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট ভাই এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
গত ৮ মে পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জেলা পর্যায়ের নকআউট, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচে ছিল নাদিরার দাপুটে উপস্থিতি। তিন ম্যাচে একাই করেছে ৬ গোল। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে একের পর এক গোল করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে সে। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দল ফাইনালে উঠলেও টাইব্রেকারে ২-১ গোলে হেরে যায়। তবে পুরো টুর্নামেন্টে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সব আলো ছিল নাদিরার দখলে।
তবে এ কঠিন বাস্তবতাও হার মেনেছে নাদিরার স্বপ্নের কাছে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের সঙ্গে মাঠে খেলতে ভালো লাগত তার। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথমবার স্কুল দলের হয়ে মাঠে নামে। এরপর ধীরে ধীরে ফুটবলই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
নাদিরা বলে, আমি ছোটবেলা থেকে ফুটবল খুব ভালো খেলি। ফুটবলের প্রতি আমার অনেক আগ্রহ কাজ করে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলায় বেশি সময় দিয়েছি। আমি নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে ভালো পারফর্ম করেছি। জেলা পর্যায়ে আমি ভালো খেলার কারণে টুর্নামেন্ট সেরা উপহার পেয়েছি এবং ক্রিকেটেও ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছি। এরপরে বরিশালে খেলার সুযোগ পেয়েছি, সেখানেও ভালো করেছি। বর্তমানে আমি ঢাকায় খেলার সুযোগ পেয়েছি।
নাদিরা আরও বলে, আমার ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা আমি জাতীয় দলের একজন নারী ফুটবলার হব। আমার বাবার সেই সামর্থ্য নেই আমাকে জাতীয় দলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত যে আর্থিক ব্যয় হবে, তার পক্ষে খরচ করা সম্ভব নয়। আমি নিজেকে জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। সমাজের বিত্তবান কেউ যদি আমাকে সহযোগিতা করে তাহলে হয়তো আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। আমি বাংলাদেশের নারী ফুটবলার হয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে চাই।
সহপাঠী মরিয়ম আক্তার বলে, আমি তার প্রতি অনেক অনুপ্রাণিত। দোয়া করি, সে যেন আরও ভালো পর্যায়ে যেতে পারে। আমিও চাই, পড়ালেখা করে বড় হয়ে ভালো কিছু করতে। আমাদের স্কুলের সব থেকে ভালো খেলোয়াড় সে। নাদিরা ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল খেলায় ভালো।
আরেক সহপাঠী নেহা বৈদ্য বলে, আমাদের সহপাঠী নাদিরা আক্তার স্কুলের অনেক সুনাম অর্জন করছে। সে ঢাকায় চান্স পাইছে; এ জন্য আমাদের অনেক ভালো লাগছে।
নাদিরার বাবা দুলাল আকন বলেন, নাদিরাকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা। আমার অর্থসম্পদে তারে নিয়া আগাইতে পারতেছি না। আমার চার ছেলেমেয়ে। যতটুকু সাধ্য আছে আমি ততটুকু চেষ্টা করতেছি।
তিনি বলেন, আমি যদি সরকারিভাবে কোনো অনুদান পাই বা কেউ যদি আমারে সাহায্য করে তাহলে আমি তারে অনেক বড় জায়গায় নিয়া যাইতে পারব। নাদিরা অনেক পুরস্কার আনছে, ঘরে থোয়ার জায়গা নাই। আমি বর্তমানে ছেলেমেয়ে নিয়ে একটি ত্রাণের ঘরে থাকি। চার ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘরে থাকতে অনেক কষ্ট হয়। আমার মেয়ের স্বপ্ন সে জাতীয় দলে খেলবে। জাতীয় দলে যাওয়া পর্যন্ত যে খরচগুলো হবে তার সামর্থ্য আমার নেই।
নাদিরার মা সাহিদা বেগম বলেন, ফুটবল-ক্রিকেট দুটাই আমার মেয়ে ফাস্টো। আমি টাকাপয়সায় আগাইতে পারি না। আমার মেয়ে এখন ঢাকায় চান্স পাইছে। ভালো খেলোয়াড় হতে হলে ওর পেছনে অনেক খরচ করতে হবে, কিন্তু সেটা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমাদের মতো গরিব মানুষের স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান হাওলাদার বলেন, নাদিরা তরুণ খেলোয়াড়। খেলোয়াড় হিসেবে ইতোমধ্যে সে সুনাম অর্জন করেছে। নাদিরার আর্থিক অবস্থা খুব বেশি একটা ভালো নয়।
পিরোজপুর জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা কৌশিক মন্ডল বলেন, নাদিরা নতুন কুড়ি স্পোর্টসে দুটো ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছে। নাদিরা দুটো খেলায় টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছে। তার যে দক্ষতা, তাকে যদি সুন্দরভাবে নার্সিং করতে পারি আমার বিশ্বাস নাদিরা শুধু পিরোজপুর নয়, দেশের নাম উজ্জ্বল করবে। নাদিরা দেশের হয়ে সর্বোচ্চ জায়গায় খেলতে পারবে।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
নকল আর হচ্ছে না, এখন লক্ষ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন: বরিশালে শিক্ষামন্ত্রী