Current Bangladesh Time
Sunday November ৮, ২০২৬ ২:২৬ PM
Barisal News
Latest News
Home » পটুয়াখালী » বাউফল » বাউফলের কারখানার পাড়ে এখন নিঃস্ব মানুষের বসতি
৮ November ২০২৬ Sunday ২:১০:৪৬ PM
Print this E-mail this

বাউফলের কারখানার পাড়ে এখন নিঃস্ব মানুষের বসতি


বাউফল (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা:


একসময় গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কাছিপাড়া ইউনিয়নের সিকদার বাড়ি ও আকন বাড়ি। কয়েক প্রজন্ম ধরে এলাকায় প্রভাব, সম্পদ ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করত বৃহৎ এই দুই পরিবার। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সবকিছু বদলে দিয়েছে কারখানা নদী। নদীভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও পারিবারিক সম্পদ হারিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে পরিবারগুলো। এখন অনেকের ঠাঁই হয়েছে সড়কের পাশে কিংবা অন্যের জমিতে।
শুধু সিকদার ও আকন বাড়ি নয়, ইউনিয়নের বাহেরচর, পশ্চিম কাছিপাড়া, হাজীপুর ও গোপালিয়াসহ কয়েকটি গ্রামের সহ¤্রাধিক পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কারও বসতঘর গেছে, কারও শেষ সম্বল ফসলি জমি। ভাঙনের মুখে রয়েছে বাজার, পুকুর, পাকা সড়ক ও তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিনিয়ত ভাঙছে নদীর পাড়, বাড়ছে মানুষের নিঃস্ব হওয়ার তালিকা।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কারখানা নদীর তীরে অবস্থিত কাছিপাড়া ইউনিয়ন। আয়তন, জনসংখ্যা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাউফলের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নগুলোর একটি এটি। অথচ নদীভাঙনে ইউনিয়নের জনপদ ও মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলোর একজন নাসরিন বেগম (৩৫)। তিন ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। ২০০৭ সালে এই নারীর বিয়ে হয় কাছিপাড়ার সিকদার বাড়ির ইব্রাহিম সিকদারের সঙ্গে।
নাসরিনের ভাষায়, একসময় তাদের বাড়িতে ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারের বসবাস ছিল। গোয়ালভরা গরু, ধানভরা মাঠ, পাকা দালান, মাছভরা পুকুর আর পাকা ঘাটলা ছিল। আত্মীয়স্বজনের কাছে বাড়িটির আলাদা পরিচিতি ছিল।
আক্ষেপ করে নাসরিন বলেন, ‘মাত্র দুই বছর আগেও সিকদার বাড়ির অস্তিত্ব ছিল। এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে ফসলি জমিতে ঘর তুলে থাকতে হচ্ছে। কারখানা নদী আমার শ্বশুরবাড়ির সবকিছু গিলে খেয়েছে। একসময় এই বাড়িতে ১০০ থেকে ১৫০ মানুষের বসবাস ছিল। এখন আমরা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছি।’
বাহেরচরের ৭৮ বছর বয়সী নিত্য গোপালের জীবনেও নদীভাঙন এনেছে সর্বস্বান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা। সড়কের পাশে টিনের ছাউনির ছোট্ট দোচালা ঘরে তার বসবাস। পাশে ছোট একটি চায়ের দোকান। সেটির আয় আর তিন মেয়ের সহযোগিতায় চলে তার ও স্ত্রীর সংসার।
নিত্য গোপালের কোনো ছেলে নেই। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বসতভিটা ও জমিজমা হারিয়ে এখন তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা মৃত্যুর পর শেষকৃত্য নিয়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বাবার কাছ থেকে ছয় একর জমি পেয়েছিলাম। নদীভাঙনে সব গেছে। আমার জমি ভেঙে যে চর জেগেছে, সেই জয়গা প্রভাবশালীদের দখলে। মরার পর শ্মশানে যাওয়ার জায়গাটুকুও নেই।
নিত্য গোপালের মতো অনুক‚ল, বাসুদেবসহ আরও অনেক পরিবার জমি ও বসতভিটা হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্যের জমিতে কিংবা সড়কের পাশে। তাদের অভিযোগ, নদীতে বিলীন হওয়া জমির বিপরীতে জেগে ওঠা চরে নিজেদের জমির কোনো অধিকার তারা ফিরে পাননি।
স্থানীয়দের দাবি, বাহেরচর থেকে গোপালিয়াবাঘা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কারখানা নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে চররঘুনদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিস্যাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোপালিয়াবাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন ঝুঁকির মুখে।
বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক জাকির সিকদার, এফ এম মামুন ও সুনীল দাস জানান, ভাঙনের কারণে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের কাছাকাছি চলে এসেছে নদী। আগে যে নদী ছিল প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে, এখন সেটি বিদ্যালয় থেকে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মিটার দূরে অবস্থান করছে বলে তারা জানান। দ্রæত তীর রক্ষা করা না গেলে বিদ্যালয়গুলো নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হিস্যাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বালাল সিকদার (৫৪) বলেন, ‘এই বিদ্যালয় থেকেই আমি পড়াশোনা করেছি। ছোটবেলার স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানটি চোখের সামনে হারিয়ে যাবে, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। নদীর তীর রক্ষায় দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে বাহেরচর বাজারসহ আশপাশের বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রক্ষা করা কঠিন হবে।
নদীভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জিওব্যাগ ফেলা হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কাছিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. ইয়াকুব বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিওব্যাগ ফেলে। কিন্তু ভাটার সময় সেগুলোর অনেক কিছুই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও বসতভিটা হারাচ্ছে মানুষ। আমরা দ্রæত ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাহেরচর এলাকায় চররঘুনদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে ১০৫ মিটার অংশে জিওব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে গোপালিয়াবাঘা অংশে এখন পর্যন্ত কোনো কাজ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমরান হোসেন বলেন, ‘কারখানা নদীসহ পায়রা নদীর ভাঙন রোধে একটি সমীক্ষার কাজ চলমান রয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হবে।’
বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালেহ বলেন, ‘নদীভাঙনের তীব্রতায় কাছিপাড়া ও কনকদিয়া ইউনিয়নের মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে। মাসিক উন্নয়ন সভায় কাছিপাড়া ও কনকদিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি তুলে ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সরেজমিন পরিদর্শন করে ভাঙনের ভয়াবহতা দেখে জরুরি তীর রক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
ঢাকা-কুয়াকাটা সড়ক: কম দূরত্বে বেশি টোল
বরিশালে বিএনপির বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সমাবেশে সংঘর্ষ
নিত্য মৃত্যুর ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক: একনেকে ঠাঁই হয়নি ছয় লেন প্রকল্পের
বরিশালে খাল খননে ৭৩০ কোটি টাকার প্রকল্প
এইচএসসিতে সবাই ফেল, বরিশালের ১১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শোকজ
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com