Current Bangladesh Time
Saturday June ১৩, ২০২৬ ৮:৫১ AM
Barisal News
Latest News
Home » বিশেষ প্রতিবেদন » স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর
১৫ March ২০১৫ Sunday ৮:০৯:১৬ AM
Print this E-mail this

স্ম র ণ

স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর


aroj-ali-matubbar আরজ আলী মাতুব্বরআজ ১৫ মার্চ। ১৯৮৫ সালের এই দিনে মানবতাবাদী চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক আরজ আলী মাতুব্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি মানুষের মাঝে মুক্তচিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে গেছেন নিজের অপরিসীম যুক্তির আলোকে। যিনি সৃষ্টি ধর্মের আলোকবর্তিকায় ধর্মীয় অন্ধকার দূর করার স্বপ্ন দেখেছেন, দেখিয়েছেন। বরিশালের চরবাড়িয়া ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম লামচরির এক গরিব কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর জ্ঞানসাধনা ছাড়িয়ে গেছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশকেও। তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও আরজ আলী মাতুব্বরই অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিয়েছেন ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আধুনিক যুগেও একজন মানুষ যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিজ প্রচেষ্টায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারেন, তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ আরজ আলী মাতুব্বর।

আরজ আলী নিজ গ্রামের মুন্সি আবদুল করিমের মসজিদের মাধ্যমে পরিচালিত মক্তবে সীতানাথ বসাকের কাছে ‘আদর্শলিপি’ পড়তেন। কিন্তু দরিদ্রতার কারণে তাঁকে মক্তব ছাড়তে হয়। এরপর তিনি কৃষিকাজে নিয়োজিত হন। পরে এক সহৃদয় ব্যক্তির সহায়তায় তিনি ২য় শ্রেনী পর্যন্ত পড়া শেষ করেন। সাথে সাথে তিনি নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় বাড়িতে বসেই লেখাপড়া শিখতে থাকেন।

নিজের জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে তিনি বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর সমস্ত বাংলা বই একজন মনোযোগী ছাত্রের মতো পড়েন। দর্শন ছিলো তাঁর প্রিয় বিষয়। কিন্তু তাঁর জ্ঞান পিপাসা মিটানোর মতো পর্যাপ্ত বই পাঠাগারে ছিলো না। পরে বই পড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ দেখে বিএম কলেজের দর্শনের শিক্ষক কাজী গোলাম কাদির মোহিত হন এবং তিনি কলেজের পাঠাগার থেকে তাঁকে বই ধার দেয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এভাবেই প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি আর কৌতূহলী মনের কারণে নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দার্শনিক, যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তার অধিকারী মানুষ হয়ে ওঠেন তিনি।

অনেক জ্ঞানী আর গুণীজনের চেয়ে তিনি আলাদা। সবচেয়ে যে বিষয়টি তাঁকে মানুষের কাছে এনেছে, তা হলো গভীর ভাবনার সহজ প্রকাশ। যেকোনো বিষয়কে চিরায়ত নিয়মে না মেনে যুক্তি দিয়ে দেখা আর অন্তর্ভেদী ব্যাখ্যাদানই ছিল তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি সহজকে তো বটেই; কঠিনকেও ব্যাখ্যা করেছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে।

তিনি একজন অন্য প্রকৃতির লেখক ছিলেন। তার কারণ তাঁর গ্রামীণ পটভূমি। তাঁর পক্ষে সমাজে বিরাজ করা অন্ধকার মেটানো সম্ভব ছিল না, কিন্তু তিনি যতদূর পেরেছেন তাঁর ক্ষীণ ও নিষ্প্রভ আলো ভয়হীন বা সন্দেহ ছাড়াই ধারণ করেছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ঘাটতি সত্ত্বেও তিনি বেশ কিছু বই লেখেন। তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে তিনি বহুল প্রচলিত নানা বিশ্বাস ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে নির্ভীক যুক্তিসংগত মত প্রকাশ করেন। ফলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ, এমনকি অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীরও চক্ষুশূল হন। কিন্তু তাঁর রচনাগুলো চিন্তাশীল মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।

ধর্ম, জগত ও জীবন সম্পর্কে নানামুখী জিজ্ঞাসা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে, যা থেকে তাঁর প্রজ্ঞা, মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর লেখালেখিতে যে দার্শনিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটে তা সবাইকে বিস্মিত করে। সমাজের নানা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসকে তিনি যুক্তি দিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন।

প্রথাবিরোধী এ লেখককে তাঁর বইগুলো প্রকাশে অনেক বাধা পেরোতে হয়েছিলো। ১৯৭৩ সালে তাঁর প্রথম বই ‘সত্যের সন্ধানে’ প্রকাশ হয়। বইটির মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেনঃ ‘আমি অনেক কিছুই ভাবছি, আমার মন প্রশ্নে ভরপুর, কিন্তু এলোমেলোভাবে। আমি তখন প্রশ্নের সংক্ষেপণ লিখতে থাকি, বই লেখার জন্য নয় শুধুমাত্র পরবর্তীতে মনে করার জন্য। অসীম সমুদ্রের মতন সেই প্রশ্নগুলো আমার মনে গেঁথে আছে এবং আমি ধীরে ধীরে ধর্মীয় গন্ডি হতে বের হতে থাকি।’ তিনি এই বইটিতে ৬টি শ্রেণীতে দার্শনিক প্রশ্নগুলো ও তাদের যৌক্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

লেখালেখির সূচনার পর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ১৫ খানি পাণ্ডুলিপি রচনা করে গেছেন। এর মধ্যে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত চারটি বইয়ের নাম: সত্যের সন্ধানে (১৯৭৩), সৃষ্টির রহস্য (১৯৭৭), অনুমান (১৯৮৩), স্মরণিকা (১৯৮২)। মৃত্যুর কিছুকাল পরে প্রকাশিত হয় আরেকটি বই। এর নাম ‘মুক্তমন’ (১৯৮৮)।

গ্রন্থাকারে প্রকাশিত এই বইগুলো ছাড়াও রয়েছে আরো কয়েকটি পান্ডুলিপি। এগুলোর নাম হচ্ছে- সীজের ফুল (কবিতা), সরল ক্ষেত্রফল (গলিত), জীবন বাণী (আত্মজীবনী), ভিখারীর আত্মকাহিনী (আত্মজীবনী), কৃষকের ভাগ্য গ্রহ (প্রবন্ধ), বেদের অবদান (প্রবন্ধ), পরিচয়, আমার জীবন দর্শন। এছাড়া, ঘটনাবলী, জন্ম বংশাবলী, বংশ পরিচয়, অধ্যয়নসার, ডাইরী ইত্যাদি পান্ডুলিপিও সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর বেশ কিছু লেখা ‘আরজ আলী মাতুব্বর রচনাবলী’ নামে কয়েকটি খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং কিছু লেখা ইংরেজীতেও ভাষান্তর করা হয়েছে।

তদানীন্তন পাকিস্তানে এবং তার পরও তাঁর কয়েকটি বইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ছিলেন। পেয়েছেন হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কর্তৃক বরণীয় মনীষী হিসেবে সম্মাননা।

শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, আরজ আলী মাতুব্বরের ব্যক্তিগত জীবনযাপনও ছিল বৈচিত্র্যময়। জ্ঞান অর্জন ও কৃষিকাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি জমি জরিপ বা আমিনের কাজ শিখে নেন। এরপর জমি জরিপের কাজকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় নানা কাজ যেমন: কামারের কাজ, জাল বোনা, মাছ ধরা, কাপড় বোনার কাজ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি পারদর্শী ছিলেন।

সারা জীবনের উপার্জন দিয়ে জমি না কিনে তৈরি করেছিলেন গ্রামের মানুষের জন্য পাঠাগার। নদীভাঙনে জমি হারিয়ে কাঁদেননি; কিন্তু সংগ্রহ করা বই নদীতে ভেসে যাওয়ায়, ছেলে হারানোর শোকে শোকার্ত হয়েছেন এ চাষি।

তবে যত সহজেই তিনি কঠিন কথার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ততটা সহজ ছিল না তাঁর দর্শন-ধর্ম-আত্মোপলব্ধির ভাবনা। শুরুটা ছিল শৈশবের একটি ব্যক্তিগত ঘটনা থেকে। ছবি তোলার অভিযোগে আরজ আলী মাতুব্বরের মৃত মায়ের দাফন করতে রাজি হয়নি গ্রামের মানুষ। প্রায় একঘরে হয়েছিলেন মাতুব্বর, আর সেই আঘাত থেকে শুরু হয়েছিলো মৌলবাদ ও কুসংস্কারের স্বরূপ উন্মোচন এবং সত্যানুসন্ধিৎসু হয়ে উঠতে তাঁর নিরন্তর চেষ্টার।

আজীবন মানব কল্যাণে নিয়োজিত আরজ আলী মাতুব্বর মৃত্যু পরবর্তীকালে তাঁর মৃতদেহটিও যাতে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয় সেজন্য গবেষণার তিনি বরিশাল মেডিকেল কলেজকে তাঁর দেহদান করে যান। আর মরণোত্তর চোখ দান করে যান দৃষ্টিহীনের চোখে আলো ফোটানোর লক্ষ্যে।

আরজ আলী জীবদ্দশাতেই তাঁর সমাধি রচনা করে গেছেন। এও এক ব্যতিক্রমী ঘটনা এই ব্যতিক্রমী পুরুষের। যেহেতু তাঁর মৃত শরীর প্রচলিত প্রথামাফিক মাটিতে শয়ান করার সুযোগ রাখেননি তাই জীবৎকালেই এক অশ্রুতপূর্ব ব্যবস্থা করে গেছেন। স্মৃতিরক্ষার বাসনা থেকেই আরজ আলী দেহহীন অসনাতন সমাধি নির্মাণ করেছেন নিজেই নিজের। আর সমাধি গোচরে চলমান পথিক ক্ষণিকের জন্য দাঁড়িয়ে হয়তো উচ্চারণ করবে -‘ Here lies Aroj Ali Matubbar, the Insurrectionist. Who loved truth and wanted to find truth. Arises questions to think people on their tradition beliefs.’

৩ পৌষ ১৩৮৬ সাল। প্রবীণ আরজ আলী মাতুব্বরের ৮০ বছর বয়স পূর্ণ হয়। এ দিনেই তিনি পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণার্থে সমাধি নির্মাণ করেন। নিজ দেহের কয়েকটি অংশ দ্বারা তিনি এই স্মৃতিধারক সমাধিস্থল রচনা করেন। শারীরিক অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে চুল, দাড়ি, নখ ও কয়েকটি দাঁত। এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর স্বপ্নের সাধনার লাইব্রেরি ভবনের সীমানার মধ্যে উঁচু বেদী আকারে নির্মিত পাকা সমাধির মধ্যে একটি কাচের বয়ামে করে এগুলো রাখা হয়। এরপর থেকে তিনি জীবনের শেষ কটি দিন পরম প্রশান্তি বোধ করেছেন।

নানা গুণে গুণী এই মানুষটি ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ ৮৬ বছর বয়সে বরিশাল শেরে বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

যে গ্রামে তাঁর মায়ের কবর দেওয়ার জন্য মানুষ পাওয়া যায়নি, সেই ক্ষুদ্র লামচরির এক অশিক্ষিত কৃষক আরজ আলী মাতুব্বরকে মৃত্যুর পর শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢল নেমেছিল মানুষের। সেদিনই প্রমাণ হয়ে গেছে, আরজ আলী মাতুব্বর বড় হতে হতে ছাড়িয়ে গেছেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সীমানাও।

৩০ তম মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে কৃতি এ সন্তানকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে বরিশালবাসী।

তথ্যসূত্র:
আরজ আলী মাতুব্বর- আইয়ুব হোসেন – বাংলা একাডেমী
ইন্টারনেট, গুণীজন

সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বন্ধ হয়ে গেল অলিম্পিক সিমেন্ট কারখানা, বিপাকে শ্রমিকেরা
বরিশাল সিটি নির্বাচন: জামায়াতের প্রার্থী হেলাল, থাকছেন না ফয়জুল
হামে বরিশাল বিভাগে মৃত বেড়ে ৫০
বরিশালে পুলিশি অনুমতি না পেয়ে জাপার সভার ভেন্যু পরিবর্তন, যা বললেন মহাসচিব
হত্যাচেষ্টা মামলায় বরিশাল- ২ আসনের সাবেক এমপি শাহে আলমকে গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com