আরজ আলী মাতুব্বর এক চারণ দার্শনিকের প্রতিকৃতি শওকত মিলটন
না কোন বিদ্যালয়ের সিল-ছাপ্পর ছিলনা। ছিলনা পরিব্রাজকের মতো দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা। তবুও মুক্তবুদ্ধি চর্চার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। শহরের আলো ঝলমল পরিবেশ থেকে দূরে গ্রামের সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়ে। নাগরিক ভাষায় ‘চাষা’ বলে যাদের গালাগাল দেয়া হয়, সেই গ্রামীণ কৃষিজীবি মানুষ আরজ আলী মাতুব্বর। আমাদের চিন্তার জগতে পুকুরের ঢিল ছোঁড়া ঢেউ তোলেননি, শেকড় ধরে নাড়া দিয়েছেন।
ক. জন্ম ও শৈশব
বরিশাল শহর থেকে বেশি দূরে নয়, লামচরি গ্রাম। এ গ্রামেই আরজ আলী মাতুব্বরের জন্ম। বাংলা ১৩০৭ সালের ৩রা পৌষ। দরিদ্র কৃষক পরিবারের ৫ম সন্তান। তাঁর বাবার মৃত্যু ঘটে জন্মের চার বছর পর। মৃত্যুর সময় বাবা এন্তাজ আলী মাতুব্বর সামান্য কিছু জমি আর ভিটাবাড়ী রেখে যান। ৫ ভাই বোনের মধ্যে বেঁচে ছিলেন ৩ জন। দু’ভাই কাজেম আলী ও ছোমেদ আলী যথাক্রমে জন্মের এক বছর ও তিন বছরের মধ্যে মারা যান। বড় বোন জিগিরজান বিবি’র বিয়ে হয় বাবার মৃত্যুর আগেই। দু’সন্তান কুলসুম ও আরজ আলীকে নিয়ে লালমন্নেসা বিবি সমস্যার অথৈ সাগরে ভাসেন। বাংলার কৃষক পরিবারের সাধারণ ছবি আরজ আলী মাতুব্বরের পরিবার লাকুটিয়া জমিদারদের খাজনা দিতে না পারায়, বাবার রেখে যাওয়া জমি নিলাম হয়ে যায়। বরিশালের জনার্দন সেনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ঋণ নিয়ে শোধে ব্যর্থ হওয়ায় সুদী মহাজন বাড়ী নিলাম করে। শূন্য ভিটায় খোলা আকাশের নীচে কয়েকদিন রাত্রি যাপনের পর গ্রামবাসীদের দয়ায় নতুন ঘর উঠে। পলকা সেই ঘরেই বড় হয় আরজ ও তাঁর বোন। দরিদ্রের নির্মম কষাঘাতে প্রতিদিন তিনবেলার খাবার পর্যন্ত জুটতো না। লালমন্নেসা বিবি গ্রামের বাড়ী বাড়ী ঝিয়ের কাজ করে সন্তানদের মুখের খাবার যোগাতেন। আরজ আলীর সময় কাটতো গ্রামের আর দশটি দরিদ্র শিশুর সাথে। লাঙ্গলের ফলায় চিরে যাওয়া মাটির বুক দেখে শিশু আরজের চোখ চকচক করে উঠতো নতুন দিনের আশায়। লামচরির পথে পথে ঘুরে বেরিয়ে প্রকৃতির সন্তানের মতোই বেড়ে উঠতে লাগলো আরজ আলী মাতুব্বর। কোনভাবে বেঁচে থাকার জন্য এ বেড়ে ওঠা।
খ. পৃথিবীর পাঠশালায় শিক্ষাগ্রহণ
আরজ আলী মাতুব্বরের জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ হয়নি। সে সময় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক কিংবা এতো স্কুলও ছিলনা। লামচরি তেমন একটি গ্রাম। লালমন্নেসা বিবি’র আর্থিক সঙ্গতি নেই যে ছেলেকে দূরের স্কুলে পাঠাবেন। আরজ আলীর স্বভাবজাত জ্ঞান পিপাসার’র স্ফুরণ ঘটে শৈশবেই। কিন্তু তাদের আর্থিক সঙ্গতি এক্ষেত্রে বিরাট বাধা ছিল। ১৩২০ সালে ঐ গ্রামে মুন্সী আঃ করিম নিজের বাড়ীতে একটি মক্তব গড়ে তোলে। বহু চেষ্টায় মক্তবের খাতায় নাম উঠলো আরজ আলীর। অন্যের বই চেয়ে পড়ে আকন্ঠ জ্ঞান পিপাসা নিবৃত্তের চেষ্টা শুরু হলো। ১৩২১ সালে এক নিকট আত্মীয়ের দেয়া আদর্শলিপি তাঁর প্রথম নিজস্ব বই। ১৩ বছরের কিশোর আরজ আনন্দে আত্মহারা। শেখার চেষ্টা, জানার চেষ্টায় উম্মাতাল কিশোরের নিত্যসঙ্গী ছিল বই। যে বই তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। মক্তবে যাবার আনন্দ আরজের বেশী দিন রইলো না। গ্রাম্য টোলের মতো এ মক্তবটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই সাথে রুদ্ধ হয় আরজের জ্ঞানের আলো দেখার পথ। কিন্তু আরজের ভেতর তখন দুর্বার আকাঙ্খা পৃথিবীকে জানার। ঠেকিয়ে রাখার মতো বাঁধন নেই। সমুদ্রের উন্মত্ত জলরাশির মতো শুধুই এগিয়ে চলা। গ্রামের সমবয়সী-বড়-ছোট যার কাছে যে বিষয়ের বই পেয়েছেন তাই এনে পড়তে লাগলেন। অবশেষে আরো পড়ার ইচ্ছায় ৭/৮ মাইল পথ পায়ে হেটে বরিশাল শহরে পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে হাজির। শুধুমাত্র পড়ার জন্যই প্রতিদিন শহরে যাওয়া আসা শুরু করে তরুণ আরজ আলী মাতুব্বর। লাইব্রেরীয়ান ইয়াকুব আলী ও টুপি ব্যবসায়ী ওয়াজেদ আলী তালুকদার এসময় তাঁকে সহায়তা করেন। পাবলিক লাইব্রেরীর পাশাপাশি শহরের শংকর লাইব্রেরী, ব্যাপ্টিষ্ট মিশন লাইব্রেরীতেও অবাধ যাতায়াত শুরু হয়। জ্ঞান সাগরে আকন্ঠ নিমজ্জিত হবার জন্য আরজ আলীর প্রানান্ত চেষ্টা। ইতোমধ্যে পরিচয় ঘটে বরিশালের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ বি এম কলেজের দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক এবং মুক্ত চিস্তার ধারক কাজী গোলাম কাদির সাহেবর সাথে। মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের প্রতিষ্ঠিত ব্রজমোহন কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরী থেকে কাজী গোলাম কাদির সাহেব বই নিতে সহায়তা করেন। শুরু হয় কাজী গোলাম কাদিরের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়, আলোচনা। পরবর্তীতে তিনি আরজ আলী মাতুব্বরের ঘনিষ্ঠজনে পরিনত হন। এ কলেজের অপর দু’ অধ্যাপক শামসুল ইসলাম ও শামসুল হকের সাথেও গড়ে ওঠে নিবিড় বন্ধুত্ব। এই তিন অধ্যাপক আরজ আলী মাতুব্বরের মুক্ত চিন্তার সঙ্গী ছিলেন সে সময়ে। আরজ আলী মাতুব্বর চিন্তা চেতনায় পরিণত হয়ে উঠতে থাকেন।
গ. পেশা ও সংসার জীবন
পেশায় আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন কৃষক। পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতায় যুবক বয়স থেকেই তিনি কৃষিকাজে নিযুক্ত হন। প্রথম জীবনে তিনি মূলতঃ কৃষি শ্রমিকের কাজ করতেন। অন্যের জমিতে কাজ করার সময়ও তিনি জ্ঞানার্জনের কথা ভোলেননি। সে সময়েও তাঁর সঙ্গী ছিল বই। চাষের ফাঁকে বিশ্রাম নেয়ার সময়ও তিনি পড়তেন। এর পাশাপাশি তিনি আমিনের কাজকর্মও শেখেন। অংকে তাঁর মেধা ছিল প্রবাদ প্রতিম। শোনা যায়, তিনি স্থানীয় বহু ছাত্রের বীজ গণিত, জ্যামিতির সমাধান করে দিতেন। ফলে খুব অল্প সময়েই তিনি জমি পরিমাপের কাজ শিখে নেন। আরজ আলী মাতুব্বর শূন্য হতে যাত্রা শুরু করে নিজের চেষ্টায় পরবর্তীকালে বেশ ভাল ভূসম্পত্তির মালিক হন। আমিনের কাজে তাঁর পসার ছিল বিস্ময়কর। জমি-জমা সংক্রান্ত সলিশ মীমাংসায় তাঁর ডাক পড়তো। জমির মাপজোকের ক্ষেত্রে তাঁর রায়ই ছিল চূড়ান্ত। চরমোনাইর পীর ছিলেন আরজ আলী মাতুব্বরের ঘোর আদর্শ বিরোধী লোক। তিনিও তাঁর সম্পত্তি উত্তরসূরীদের মধ্যে বন্টন করতে আরজ আলী মাতুব্বরের স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন।
আরজ আলী মাতুব্বরের বিয়ে হয় ১৩২৯ সালের ২৯ অগ্রহায়ণ। ১৩ বছর বয়সের লালমন বিবির সাথে। লালমন বিবির গর্ভে আরজ আলী মাতুব্বরের ৮ সন্তানের জন্ম হয়। এরা হচ্ছে আঃ মালেক, এশারণনেছা, ফয়জন্নেসা, ছলেমান নেসা। আরজ আলী মাতুব্বর প্রথম বিয়ের ১১ বছর পর তাঁর ছাত্রী সুফিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। সুফিয়া খাতুনের বাবা আঃ করিম মৃধার সাথে আরজ আলীর সু-সম্পর্ক ছিল। প্রায়শ: সুফিয়া খাতুনের বাড়ী যেত আরজ আলী মাতুব্বর। তিনি সুফিয়া খাতুনকে পড়াতেন। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিলেন সুফিয়া খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষে আরজ আলীর ঔরসে ৬ সন্তানের জন্ম হয়। এরা হচ্ছে আঃ খালেক, আঃ বারেক, বিয়াম্মা বেগম, নূরজাহান বেগম, হাজেরা খাতুন ও মনোয়ারা বেগম। মোটামুটি স্বচ্ছল সংষারের মধ্যেই তাঁর সন্তানেরা বেড়ে উঠেছে।
ঘ. মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও নিষিদ্ধ আরজ আলী
মায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন নতুন মোড় নেয়। মায়ের লাশের ছবি তোলাকে ইস্যু করে চরমোনাই পীর সাহেবের মুরীদদের ফতোয়া প্রদানকে কেন্দ্র করে কুসংস্কারাচ্ছান্ন গ্রামের মানুষ জানাযা পড়তে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর থেকে আরজ আলীর মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়। মনে জাগে নানা প্রশ্ন। আরজ আলী মাতুব্বর কতগুলো প্রশ্ন তৈরী করেন। এ সময় তাবলীগ জামাতের আমীর ও তৎকালীন বরিশালের ম্যাজিস্ট্রেট এফ. করিম তাবলীগ জামাতের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য লামচরি গ্রামে যান। গ্রামের লোকেরা তাকে আরজ আলী মাতুব্বরের কাছে পাঠায়। আরজ আলীকে এফ. করিম তাবলীগ জামাতে আসার আমন্ত্রণ জানালে ‘না বুঝের প্রশ্ন’ করেন জগৎ, জীবন ও ধর্মচর্চা সম্পর্কে। এনিয়ে এফ. করিমের সাথে তাঁর ‘বাহাস’ হয়। অবশেষে ‘চাষা’ আরজ আলীর ঔদ্ধত্যে ম্যাজিষ্ট্রেট ক্ষুদ্ধ হয়। ১৩৫৮ বাংলা সালের ১২ জ্যৈষ্ঠ এ ঘটনা ঘটে। বরিশাল পৌছে এফ. করিম কমিউনিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করে মামলা দায়ের করে, গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করে। এ নিয়ে অনেক কিছু হয়। ঐ মামলার জবানবন্দি হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেট এফ. করিমকে প্রদত্ত প্রশ্নগুলো ব্যাখ্যা লিখে ১৩৫৮ সালের ২৭ আষাঢ় বরিশালের পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে আদালতে দাখিল করেন। এ ব্যাখ্যাগুলি তিনি ‘সত্যের সন্ধ্যান’ নাম দিয়ে পেশ করেছিলেন। মামলায় তিনি জিতলেও ‘সত্যের সন্ধান’ প্রকাশ ও ধর্মীয় মতবাদের সমালোচনামূলক গ্রন্থ রচনার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। নিষেধাজ্ঞা আসে বক্তৃতা-বিবৃতি, সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখার উপর। এ নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ২২ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৩৮০ সালে পুস্তকাকারে ‘সত্যের সন্ধান’ বইটি প্রকাশিত হয়। ১৩৯০ সালে বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। তিনি বইটির প্রচ্ছদও নিজে করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় ‘সত্যের সন্ধান’ ছাড়াও আরো তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এগুলো হচ্ছে ‘অনুমান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’ এবং আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী’র ‘স্মরণিকা’। ‘মুক্তমন’ নামে অপর একটি সংকলন গ্রন্থ সম্পাদনা করে প্রকাশ করার প্রস্তুতি পর্বে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর ‘মুক্তমন’ প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিনি অপ্রকাশিত ৬টি পূর্ণ্য পান্ডুলিপি রেখে গেছেন। এগুলো হচ্ছে আত্মজীবনী ‘ভিখারীর আত্মকাহিনী’ ও ‘জীবনবাণী’, কাব্যগ্রন্থ ‘সীজের ফুল’, প্রবন্ধ ‘কৃষকের ভাগ্য’ ও ‘বেদের অবদান’ এবং অংক শাস্ত্রের উপর লেখা ‘সরল ক্ষেত্রফল’। এছাড়াও বংশাবলী, ডায়রী ও অন্যান্য আরো কিছু পান্ডুলিপি রেখে গেছেন।
ঙ. সংবর্ধনা ও পুরস্কার প্রাপ্তি
 বাংলা ১৩৯২ সালের ১লা বৈশাখ নববর্ষে বাংলা একাডেমী আরজ আলী মাতুব্বরকে আজীবন সদস্য পদ প্রদান করে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে বাংলা একাডেমি। ছবিতে সর্বডানে আরজ আলী মাতুব্বর।
চারণ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর মুক্ত চিন্তার আন্দোলনে গতির সঞ্চার করেন। তিনি তাঁর ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থের জন্য বাংলা ১৩৮৪ সালে ‘হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরষ্কার’ লাভ করেন। বাংলাদেশ লেখক শিবির প্রথম সংগঠন যারা শহুরে নাক উঁচু বুদ্ধিজীবী মহলকে উপেক্ষা করে এই চারণ দার্শনিককে আনুষ্ঠানিক সম্মাননা প্রদান করে। বাংলা ১৩৮৯ সালে বরিশাল সাহিত্য পরিষদ তাঁকে সংবর্ধনা দেয়। উদীচী শিল্পী বরিশাল জেলা শাখা ১৯৮২ ইংরেজী সালে আরজ আলী মাতুব্বরকে ‘গুণিজন সংবর্ধনা’ প্রদান করে। ১৯৮৫ ইংরেজী সালে বাংলা একাডেমি আরজ আলী মাতুব্বরকে সংবর্ধনা প্রদান করে। তাঁকে বাংলা একাডেমি ফেলোশীপও প্রদান করেছিল। সবচেয়ে বেশী যে জিনিস পেয়েছিলেন তা হচ্ছে দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ভালোবাসা ও সাহচার্য। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম বুদ্ধিজীবী রাজধানী ও শহর কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আরজ আলী মাতুব্বরকে তুলে ধরেন। ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থটি বুদ্ধিজীবী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তাঁরা এ লেখাটি আরজ আলী মাতুব্বরের বলে স্বীকৃতি দিতে উসখুস করছিলেন। অনেকের ধারণা ছিল কোন বুদ্ধিজীবী ছদ্ম নামে এটি লিখছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘কল্পিত নাম নয়। ছদ্ম নাম নয় কারো। আরজ আলী মাতুব্বরের নিবাস বরিশাল।’ আরজ আলী মাতুব্বর দেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবীদের বন্ধু, শুভানূধ্যায়ী হিসেবে পেয়েছিল। পেয়েছিল তাদের উষ্ণ সান্নিধ্য। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন দর্শন বিভাগের ক্লাস নিয়েছেন।
চ. আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী নির্মাণ
আরজ আলী মাতুব্বরের আজন্ম লালিত সাধ ছিল একটি লাইব্রেরী গড়ে তোলার। তিনি লাইব্রেরীকে তাঁর শিক্ষাপিঠ মনে করতেন। তিনি লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় বলেছিলেন, দারিদ্র নিবন্ধন কোন স্কুল-কলেজে গিয়ে পয়সা দিয়ে বিদ্যা কিনতে পারিনি আমি, দেশের অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের মতো। তাই কোন স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা আমার শিক্ষাপীঠ নয়। আমার শিক্ষাপীঠ হলো ‘লাইব্রেরী’। আশৈশব আমি লাইব্রেরীকে ভালোবেসে এসেছি এবং এখনো ভালবাসি। লাইব্রেরীই আমার তীর্থস্থান। আমার মতে- মন্দির, মসজিদ, গীর্জা থেকে লাইব্রেরী বহুস্থানে শ্রেষ্ঠ।’ আরজ আলী মাতুব্বরের বইয়ের প্রতি দুর্বলতা ছিল মাত্রাধিক। সংসারের অভাব-অনটন উপেক্ষা করে তিনি যৌবনে বই সংগ্রহ করতেন। ১৩৩০ সাল থেকে ১৩৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি ৯শ’ বই সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর বাড়ীর বৈঠক খানার তাকে থরে থরে এ বই সাজানো ছিলো। ১৩৪৮ সালের ১২ই জ্যৈষ্ঠ সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড়ে বৈঠক খানার সাথে সঞ্চিত বইগুলোও উড়িয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় তিনি মারাত্মক আঘাত পান। পরবর্তীতে আবার তিনি সংগ্রহ শুরু করেন। ১৭ বছরে ৪শ’ বইয়ের সংগ্রহ ১৩৬৫ সালের ৬ই কার্তিক আবার ঝড়ে নষ্ট হয়ে যায়। আরজ আলী মাতুব্বর তখনই একটি পাকা লাইব্রেরী ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেন।
অবশেষে ১৩৬৮ সালের ১৯ আষাঢ় স্থানীয় রাজমিস্ত্রি আঃ মজিদ মুন্সিকে দিয়ে দিয়ে আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর নির্মাণ কাজ শুরু করান। ঐ বছরের ৩১ ভাদ্র তিন কক্ষের লাইব্রেরী ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মিস্ত্রিদের সাথে কাজ করেছেন। তিন কক্ষের এ ভবনের বড় কক্ষটি (১০ফুট ী ১০ফুট) লাইব্রেরী, ক্ষুদ্র কক্ষটি (১০ফুট ী ৪ফুট) স্মৃতিমালা বা যাদুঘর। যেখানে আরজ আলী মাতুব্বরের ব্যবহার্য জিনিসপত্র রয়েছে। বারান্দা (১৪ফুট ী ৬ফুট) রয়েছে পাঠকদের পড়ার জন্য। ২৫ জানুয়ারী’৮১ বরিশালের ডেপুটি কমিশনার আঃ আউয়াল লাইব্রেরীর আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করেন। উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সিরাজুল হক সভাপতিত্ব করেন। উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্তিত ছিলেন এডিসি কাইয়ুম ঠাকুর, প্রেসক্লাব সভাপতি আঃ কাউয়ুম, কাজী গোলাম কাদির, প্রফেসর মোঃ হানিফ, প্রফেসর সিরাজুল হক, প্রফেসর বদিউর রহমান, সৈয়দ মোশারারফ হোসেন প্রমূখ। তিনি একটি ট্রাষ্ট গঠন করে স্থানীয় কয়েকটি প্রাইমেরী ও হাই স্কুলে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন।
ছ. সমাধি নির্মাণ
মৃত্যুর বহু আগে আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর সমাধি নির্মাণ করে গেছেন। যদিও সমাধিতে তাঁর পরিত্যক্ত চুল, নখ ছাড়া কিছুই নেই। ১৩৮৬ সালের ৬ আশ্বিন সমাধি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। মেঝের অংশ ছাড়া ১১ আশ্বিণ নির্মাণ কাজ শেষ হয়। স্থানীয় মোল্লারা রাজমিস্ত্রি আঃ মজিদ মুন্সিকে সমাধির মেঝের অংশ পাকা করা শরীয়ত বিরোধী বলে নির্মাণ করতে নিষেধ করেন। আরজ আলী মাতুব্বর নিজের হাতে মেঝের কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ করেন। সমাধির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উপরে একটি কংক্রিটের স্লাব দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। যথারীতি একদিন পরিচিত জনদের নিয়ে চা-চক্র অনুষ্ঠান করে পরিত্যক্ত চুল, দাড়ি-নখ সমাধি গর্তে রেখে দেন।
জ. মানব কল্যাণে মরনোত্তর চোখ ও দেহ দান
তার বসবাস ছিল গ্রামে। স্বীয় চেষ্টায় শিখেছেন পড়াশুনা। স্বতঃ প্রনোদিত হয়ে লিখেছেন দর্শস বিষয়ে। কিন্তু মরনোত্তর চক্ষু ও দেহদান তাাঁর অবিস্মরণীয়, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ১৩৮৮ সালের ১৯ অগ্রহায়ণ দানপত্র করে তাঁর দেহ বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়নকারী ছাত্রদের ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য দিয়ে যান। তাঁর এ দানপত্রে সাক্ষী ছিলেন পুত্র আঃ মালেক মাতুব্বর, শুভানূধ্যায়ী ইয়াছিন আলী শিকদার এবং গোলাম রসুল মোল্লা। তিনি তাঁর সন্তানদের উদ্দেশ্যে এ বিষয়ে একটি অছিয়ত নামা তৈরী করে যান। তিনি তাঁর অছিয়ত নামায় বলে গেছেন, ‘মৃত্যুর পর আমার শব দেহটি জলে ধৈৗত পূর্বক পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়া (নূতন বা পুরাতন) বস্ত্রাবৃত করিবা। হয়ত খোশবু ব্যবহার করিবা। ইহা ছাড়া অন্য কোনরূপ চিরাচরিত প্রথা রক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন হইবা না।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমার বিদেহী আত্মার কল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করার জন্য কাহাকেও পীড়াপীড়ি বা সেই জন্য অর্থ ব্যয় করিবা না। তবে কাহারও স্বেচ্ছাকৃত প্রার্থনা বা আশীর্বাদ আমার অবাঞ্ছিত নহে।’ আরজ আলী মাতুব্বর মারা যাবার পর সন্ধানীর অবহেলার কারণে চোখ দুটি সংগ্রহ করা হয় দেরীতে। আরজ আলী মাতুব্বর চোখ দান করলেও সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি নিজেদের ভুলের কারণে তা কোন কাজে লাগাতে পারেনি। দেহটি অবশ্য মেডিকেল কলেজে ছাত্রদের ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হয়।
ঝ. অসাধারণ মানুষের সরল মহাপ্রস্থান
আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর বংশের অপরাপর ব্যক্তিদের জীবর পর্যালোচনা করে গড় আয়ু ৬০ বছর হিসেব করে বের করেন। তাই তিনি ৬০ বছর পূর্ণ হবার পর ১৩৬৭ সালে তাঁর সম্পত্তি স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের মধ্যে ভাগ করে দেন। পরবর্তী ২০ বছর তিনি লেখালেখি, অধ্যয়ন ও বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর সাথে তত্বীয় আলোচনা, সমালোচনা, গ্রন্থ প্রকাশ এবং লাইব্রেরী সংগঠনের কাজ করেন। এর ফাঁকে ফাঁকে বাড়তি আয়ের জন্য আমিনের কাজ করেছেন। এ থেকে আয়কৃত ৬০ হাজার টাকায় তিনি আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী নির্মাণ করেন। ১৩৯২ সালের শেষ ফাল্গুনের দিকে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। ১লা চৈত্র তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতাল প্রাঙ্গনেই তাঁর জানাযা হয়। জানাযা শেষে তাঁর শবদেহ মেডিকেল কলেজের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই সাথে স্তব্দ হয়ে যায় আজন্ম লড়াকু, জ্ঞান পিপাসু এ দার্শনিকের গতিময়তা। আরজ আলী মাতুব্বর আমাদের চিন্তার শেকড় ধরে খুব জোরে নাড়া দিয়েছেন। দেখিয়ে গেছেন বিপ্লবীরা মেহনতি মানুষের মধ্য থেকেই জন্ম নেয়। জ্ঞান কারো কুক্ষিগত সম্পদ নয়। কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামী আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন মূর্তিমান প্রতিবাদ। তাঁর সে প্রতিবাদ আজ লক্ষ প্রাণে ছড়িয়ে পড়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
১. ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা।
২. স্মরণিকা, আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী।
৩. সুফিয়া খাতুনের সাক্ষাৎকার।
৪. ইয়াছিন আলী শিকদারের সাক্ষাৎকার।
৫. ফজলুর রহমানের সাক্ষাৎকার।
৬. ইকবাল হোসেন মিলটনের সাক্ষাৎকার।
[লেখাটি বরিশাল থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা ‘আনন্দলিখন’ এর ৪র্থ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ৯৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত সে সংখ্যায় এ লেখাটি প্রচ্ছদ নিবন্ধ হিসেবে স্থান পেয়েছিল। লেখক ও প্রকাশকের অনুমতি নিয়ে আমাদের বরিশাল ডটকমের পাঠকদের জন্য লেখাটি পুন:প্রকাশ করা হলো।]
সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক |