নেই ঘর-সংসার নেছারাবাদের অমলের, ২৬ বছর ধরে খাচ্ছেন ঘাস-লতাপাতা
নেছারাবাদ (পিরোজপুর) প্রতিনিধি:
পিরোজপুরের নেছারাবাদের সারেংকাঠি ইউনিয়নের বাসিন্দা অমল কৃষ্ণ সুতার। বয়স ৬৬ বছর। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে তার ভাগ্যে জোটেনি নিজের কোনো ঘরবাড়ি; গড়ে ওঠেনি সংসার। স্ত্রী-সন্তান তো দূরের কথা, আাপন বলতে নেই কেউ। খাবারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা নানা ধরনের উদ্ভিদের ওপর।
প্রায় ২৬ বছর ধরে জঙ্গল, চর, খাল-বিল ও জলাভূমি থেকে ঘাস-লতাপাতা ও কচুরিপানা সংগ্রহ করে খেয়ে আসছেন অমল কৃষ্ণ। কখনো কাঁচা, কখনো নিজের মতো করে প্রস্তুত করা হয় এসব খাবার। নির্দিষ্ট কোনো খাদ্যতালিকা নেই তার। প্রকৃতিতে যেদিন যা পাওয়া যায়, সেটিই হয়ে ওঠে তার খাবার।
জানা গেছে, অমল কৃষ্ণ ১৯৮১ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার দিন কাটতে থাকে। প্রায় ২৬ বছর আগে দারিদ্র্যের কারণে তীব্র খাদ্যসংকটের সময় জঙ্গল ও জলাভূমিতে পাওয়া বিভিন্ন উদ্ভিদ খাওয়া শুরু করেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সে অভ্যাসই তার জীবনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। নিজের কোনো ঘরবাড়ি না থাকায় অমল কৃষ্ণ কখনো পরিচিতজনের বাড়িতে, আবার কখনো অন্যের ঘরে রাত কাটান। তাকে কখনো ইন্দুর হাট ফেরিঘাট এলাকায় একটি জরাজীর্ণ ঘরে অবস্থান করতেও দেখা যায়। নিজের কোনো সংসার না থাকায় জীবনের শেষ বয়সেও একাকী পথ চলছেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে তারা অমল কৃষ্ণকে একইভাবে জীবনযাপন করতে দেখছেন। সকাল কিংবা দুপুরে কখন খাবেন, কী খাবেন- কোনো নিশ্চয়তা নেই। খাবারের সন্ধানে দিনের বড় একটি সময় তাকে বন-জঙ্গল, নদীর চর কিংবা জলাভূমিতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
তবে এত দীর্ঘ সময় এমন জীবনযাপন করেও বর্তমানে তাকে শারীরিকভাবে বেশ সতেজ দেখা যায় বলে জানান স্থানীয়রা।
নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসকদের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তার শরীরে উল্লেখযোগ্য কোনো রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অমল কৃষ্ণ বলেন, ‘প্রায় ২৬ বছর ধরে এসব খেয়ে আমি ভালো আছি। বিষাক্ত কোনো কিছু খাই না। অভাবের কারণে এসব খাওয়া শুরু করেছিলাম। পরে সেটাই অভ্যাস হয়ে গেছে। এখনো খেয়ে যাচ্ছি। আমার কোনো রোগ-বালাই নেই।’
স্থানীয় শিক্ষক অনুপ কুমার বলেন, ‘প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে অমলকে এভাবেই দেখে আসছি। জঙ্গল ও খাল-বিল থেকে খাবার সংগ্রহ করে খায়। এত বছর পরও তাকে বেশ সতেজ মনে হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন বলেন, ‘এ ধরনের জীবনযাপন করা মানুষ এলাকায় খুবই বিরল। প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে তাকে একইভাবে দেখে আসছি।’
নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের জীবনযাপন অত্যন্ত বিরল। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বন্য ও জলজ উদ্ভিদ খেয়ে একজন মানুষের টিকে থাকা অবশ্যই ব্যতিক্রমী। অমল কৃষ্ণকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বর্তমানে কোনো রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
তবে চিকিৎসকেরা কোনো রোগের প্রমাণ না পেলেও অপরিচিত বা বন্য উদ্ভিদ খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কোন উদ্ভিদ নিরাপদ আর কোনটি বিষাক্ত তা নিশ্চিত না হয়ে এসব খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
৬৬ বছর বয়সে এসে অমল কৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো পৃথিবীর চারপাশে অসংখ্য ঘরবাড়ি থাকলেও তার নিজের বলে নেই কোনো ঘর। নেই স্ত্রী, নেই সংসার, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তাও। অভাবের তাড়নায় শুরু হওয়া ২৬ বছরের এই জীবনযাপন এখন নেছারাবাদের মানুষের কাছে এক ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর জীবনকাহিনি হয়ে উঠেছে।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশালে নাশকতার বৈঠকের অভিযোগে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী আটক