‘মহাসেনে’ ক্ষতিগ্রস্থদের গৃহ পুনর্বাসন দুর্গতদের তালিকায় প্রভাবশালীদের নাম, বঞ্চিত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা! মনোতোষ হাওলাদার
 মহাসেনে ক্ষতিগ্রস্থ হতদরিদ্র কমলা সুন্দরীর চালাবিহীন ঘর। এরপরও তার ও হতদরিদ্রদের নাম ওঠেনি ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকায় (ছবিঃ আমাদের বরিশাল ডটকম)
বামনা :: ষাটোর্ধ বিধবা দরিদ্র কমলা সুন্দরী অতি পূরানো ছোট টিনের ঘরটির চালা সমেত উড়িয়ে নিয়েছিল সাম্প্রতিক ঘূর্নিঝড় মহাসেন। বিধ্বস্ত ঘরে নতুন টিনের ছাউনি দেওয়ার মত কোন উপায় না থাকায় সেই থেকে খোলা আকাশের নিচে বৃদ্ধা কমলা । বৃষ্টি দিনে এই বিধবার থাকার মত ঘর নেই। তাই ঘরহারা কমলা এ বাড়ি ও বাড়ির আশ্রয়ে থাকেন।
মহাসেনে গৃহহারা এ বৃদ্ধার আশা ছিল সরকার ঘরে নতুন টিন ও কিছু খাদ্য সহায়তা দেবে। ঘূর্ণিঝড় মহাসেনর পর যদিও সরকার দুই দফা সহায়তা দিয়েছে তবে কোন তালিকায়ই বৃদ্ধার নাম নেই। প্রথম দফায় নগদ কিছু অর্থ ও পাঁচ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। সে তালিকায় বৃদ্ধার নাম ওঠেনি।
পরে সরকার গৃহ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুই বান্ডিল ঢেউটিন আর ঘর মেরামতের জন্য নগদ দুই হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক তালিকা তৈরীর পর সেখানেও গৃহহীন দরিদ্র কমলার নাম নেই। অথচ ঘরের কোন ক্ষতি হয়নি আর ধনাঢ্য ব্যক্তিরা গৃহ পূণর্বাসনের তালিকায় রয়েছে। এমনকি প্রভাবশালী আর স্বচ্ছল ব্যক্তিদের নাম রয়েছে দূর্গতদের তালিকায়।
সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে বরগুনার বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ঘোলাঘাটা গ্রামের মৃত আশুতোষ সিকদারের স্ত্রীর কমলা সুন্দরীর বসত ঘরের চালা সমেত উড়ে গিয়ে গৃহহীন হওয়ার পরেও ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় এই দরিদ্র গৃহহীন বৃদ্ধার নাম ওঠেনি। শুধু কমলা সুন্দরীই নয় ,বরগুনার বামনার চার ইউনিয়নে গৃহপূনর্বাসনের তালিকায় অনেক দরিদ্র গৃহহীনদের নাম বাদ দিয়ে সেখানে ধর্নাঢ্য ব্যক্তিদের তালিকা তৈরী করা হয়েছে। এতে প্রকৃত অনেক দরিদ্র গৃহহীন ও ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন । মহাসেনে গৃহহারা হওয়ার পর সহায়তার তালিকায় নাম না থাকার অভিযোগ এনে বঞ্চিতরা উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তার বরাবরে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
গোলাঘাটা গ্রামের বিধবা কমলা সুন্দরীর ছেলে আনন্দ সিকদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ে ঘরের ক্ষতি হইল, গাছপালা গেল, ফসলের জমি ডুবল অথচ কোন সাহায্য পাইলাম না। তালিকায় আমাগো নাম নাই। অথচ কোন ক্ষতি হইলনা গ্রামের মাতবরগো (ধনী ও ক্ষমতাবান লোকজনের) নাম তালিকায় ওঠছে। গরীব মাইনষেরে দেখার আসলে কেউ নাই।’
এ ব্যাপারে রামনা ইউনিযনের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিধবা কমলা সুন্দরীর ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরমতের জন্য কমলা সুন্দরীর ছোট ছেলের নাম তালিকায় লিপিবদ্ধ করেছিলাম। পরে চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওই নাম কেটে একই গ্রামের আব্দুর রশিদের নাম তালিকাভূক্ত করেন।’
অনুসন্ধানে জানাগেছে, ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে বরগুনার বামনা উপজেলায় ৭২০টি বসত ঘরের আংশিক ক্ষতির তালিকা নিরুপন করে প্রশাসন। সরকার ওই আংশিক গৃহক্ষতির পূনর্বাসন সহায়তা হিসেবে ৭২০টি পরিবারের জন্য গৃহসহায়তা হিসেবে গৃহ প্রতি নগদ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। এতে ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়। পরে প্রশাসন সমুদয় বরাদ্দ দিয়ে তালিকা দীর্ঘ করে ৯৮০টি পরিবারের জন্য পরিবার প্রতি দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ দুই হাজার টাকা বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়। সে লক্ষে সংশ্লিষ্ট চার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা তাদের ইচ্ছে মাফিক তালিকা তৈরী করে উপজেলা প্রশাসনে জমা দেয়।
অভিযোগ উঠেছে স্বজনপ্রীতি আর অনিয়মের। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা তার এলাকায় নিজের ভোটারদের মন রক্ষা আর স্বজনপ্রীতি করে তালিকায় কোন ক্ষতি হযনি এমন লোকদের নাম তালিকাভূক্ত করে। এতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা তালিকা থেকে বাদ পড়ে। রাজনৈতিক নেতা, সাবেক ইউপি সদস্য,প্রবাসী পরিবার,কলেজ ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের নাম থাকলেও অতিদরিদ্র গৃহ ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়েছেন।
মাঠ পর্যায় অনুসন্ধান করে দেখোগেছে, বামনা উপজেলা সদর ইউনিযনের কলাগাছিয়া গ্রামের গণি আকনের ছেলের মতি মিয়ার বসতঘর টিনশেড বিল্ডিং। মহাসেনে তার ঘরের কোন ক্ষতি না হলেও তালিকায় তার নাম রয়েছে। অবাক ব্যাপার হল ওই গ্রামের ইউসুব আলী আকনের ছেলে কলেজ পড়ুয়া ছাত্র মো. জাফরের নাম রয়েছে তালিকায়। সফিপুর গ্রামের আউয়াল মুসুল্লীর পাকা ঘর থাকলেও তার নাম উঠেছে তালিকায়।
তবে কলাগাছিয়া গ্রামের দরিদ্র আব্দুল মালেক, মো. শিপন, আনোয়ারা বেগম, মো. নিজাম, মজিবর.খলিল, কামাল ও সুমনসহ অন্তত ২৫টি দূর্গত পরিবারের নাম তালিকায় নেই। সহায়তা বঞ্চিত এসব পরিবার উপজেলা র্নিাহী কর্মকর্তার বরাবরে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
রামনা ইউনিযনের কড়ইতলা গ্রামের ধর্নাঢ্য মো. খলিলুর রহমানের দুই ছেলে সৌদি প্রবাসী। এছাড়া মহাসেনে তার পাকা টিনের ঘরের কোন ক্ষতি না হলেও তার স্ত্রী পিয়ারা বেগমের নামে টিন ও নগদ টাকা পাওয়ার তালিকায় নাম রয়েছে।
এ ব্যাপারে গৃহ পুনর্বাসন কাজের তদারকি কর্মকর্তা (ট্যাগ অফিসার) গৌতম চন্দ্র বসু আমাদের বরিশাল ডটকমকে বলেন, ৯৮০টি পরিবারের প্রথম তালিকা তদন্ত করে তেমন অসংগতি পাওয়া যায়নি। পরে ওই তালিকা দ্বিতীয় দফায় নতুন করে তালিকা করা হয়েছে বলে শুনেছি। নতুন তালিকা আমার পর্যবেক্ষন করা হয়নি।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করেছে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা। ওই তালিকা তদারকির জন্য চারজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় অসংগতি ও অনিয়ম হয়েছে কিনা – জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় অসংগতির অভিযোগ উঠেছে স্বীকার করে বলেন, এবিষয়ে অনেকই লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তদন্ত করে সুষ্ঠ বন্টনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |