Current Bangladesh Time
Tuesday September ২৯, ২০২৬ ১:২১ AM
Barisal News
Latest News
Home » বরিশাল » সংবাদ শিরোনাম » বরিশালের যেসব নদীতে বড় লঞ্চ চলত সেগুলো এখন ‘মরা খাল’
২৭ September ২০২৬ Sunday ৩:১০:৪৯ PM
Print this E-mail this

বরিশালের যেসব নদীতে বড় লঞ্চ চলত সেগুলো এখন ‘মরা খাল’


বিশেষ প্রতিনিধি:

‘ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল’। ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই বরিশালে একসময় জালের মতো ছড়িয়ে ছিল নদী এবং খাল। কিন্তু কালের বিবর্তে দখল, দূষণ, উন্নয়ন আর শাসনের অভাবে অস্তিত্ব হারাচ্ছে বরিশালের ঐতিহাসিক নদী-খাল।

একসময় যেসব নদীতে বড় বড় লঞ্চ চলতো সেই নদীগুলো এখন মরা খালে পরিণত হচ্ছে। যেখানে লঞ্চ বা জাহাজ দূরের কথা, এখন ট্রলারও চলাচল করতে পারছে না। তবে খাল উদ্ধারে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ দেখা গেলেও নদীর ঐতিহ্য ফেরাতে ভূমিকা নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৮টি নদ-নদী রয়েছে। যার আয়তন ৭১৬ কিলোমিটার। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, প্রতিটি নদীতেই একসময় দূরপাল্লার রুটের যাত্রীবাহী এবং নৌযান চলাচল করত। এখন তা কেবলই ইতিহাস।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলা, বাকেরগঞ্জ এবং ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সীমান্ত হয়ে প্রবহমান খয়রাবাদ নদী। নলছিটির দপদপিয়া ইউনিয়নে কীর্তনখোলা নদী থেকে উৎপত্তি হওয়া প্রায় ৪১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২৮২ মিটার প্রস্থের এই খয়রাবাদ নদীটি সিধকাঠি, গারুরিয়া এবং বাকেরগঞ্জ পৌরসভা হয়ে কলসকাটি ইউনিয়নে বুড়িশ্বর-পায়রা নদীতে পতিত হয়েছে।

বরিশাল সদর উপজেলার কর্ণকাঠি গ্রামের বাসিন্দা মো. হাকিম আলী বলেন, ‘চোখের সামনেই খয়রাবাদ নদীটি খালে পরিণত হয়েছে। একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় যাত্রীবাহী লঞ্চ এবং জাহাজ চলাচল করতো। তখন নদীটির যে গর্জন ছিল তাতে আমরা নদীর তীরের মানুষেরা সব সময় ভাঙনের আতঙ্কে থাকতাম। তবে সেই নদীতে এখন বড় কোনো ট্রলারও ঢুকতে পারে না। এখন বর্ষা মৌসুমে কিছু ছোট ট্রলার দেখা গেলেও শীত বা শুষ্ক মৌসুমে তাও চলে না।

একই গ্রামের বাসিন্দা শাহে আলম মাঝি। যিনি দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে খয়রাবাদ নদীতে ডিঙি নৌকা নিয়ে মাছ ধরেন। এখনো পুরানো অভ্যাস রয়ে গেলেও পেশা হিসেবে ক্ষুদ্র ব্যবসা বেছে নিয়েছেন। ২০১১ সালে কীর্তনখোলা এবং খয়রাবাদ ব্রিজ নির্মাণের পর থেকেই খয়রাবাদ নদীটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। নদীর উৎপত্তিস্থল কীর্তনখোলা এবং পতিত হওয়া বুড়িশ্বর নদীর মুখে ডুবো চরের কারণে খয়রাবাদ নদীতে লঞ্চ এবং পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর নদীশাসন না হওয়ায় ধীরে ধীরে খয়রাবাদ নদীটি এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে।

একই অবস্থা বরিশালের হিজলা উপজেলাধীন লতা নদীর। স্থানীয় উন্নয়ন কর্মী সেলিম রাঢ়ী জানান, একসময় কোকোসহ বরিশাল-ঢাকা রুটের বড় বড় লঞ্চ চলতো লতা নদী হয়ে। ভাষানচর থেকে উৎপত্তি হওয়া এই নদীপতিত হয়েছে হিজলা সদরে। কিন্তু গত প্রায় ২২ বছর ধরে ১৪ কিলোমিটারের এই নদীতে আর লঞ্চ চলাচল করে না। মাঝে মধ্যে ছোট ট্রলার দেখা যায়। ডুবোচর এবং শাসনের অভাবে নদীটি এখন ছোট খালে পরিণত হচ্ছে।

অন্যদিকে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কঁচা নদীর বড় একটি অংশ এখন মৃতপ্রায়। অথচ এই নদীটি একসময় উপজেলার সাতলা ও হারতা অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির বড় একটি অংশ ছিল।

জানা গেছে, উপজেলার সাতলা ইউনিয়ন এলাকায় প্রবহমান বিশারকান্দী-বাগদা নদী থেকে উৎপত্তি কঁচা নদীর এই অংশটি। যা পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়ন হয়ে কালীগঙ্গা নদীতে পতিত হয়েছে। 

স্থানীয় হারতা ইউনিয়নের শফিক তালুকদার বলেন, ‘কঁচা নদীপথ একসময় এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম ছিল। এই নদীতে প্রায় দেড়শ বছরের নৌকাবাইচের ঐতিহ্য রয়েছে।

বরিশাল, উজিরপুরের সাতলা ও হারতা বাজার থেকে পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি), হুলারহাট ও খুলনা অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রুটে ছোট-বড় যাত্রীবাহী লঞ্চ ও কার্গো চলাচল করত। ঢাকার সদরঘাট থেকে পয়সারহাট ও সাতলাগামী বিশেষ লঞ্চগুলোও এই নদীপথের আশপাশের সংযোগ ও মোহনা ব্যবহার করে যাতায়াত করত। কিন্তু দীর্ঘ বছর ধরে এই নদীতে লঞ্চ ঢুকতে পারে না। ডুবোচরের কারণে নদীর গতিপথ হারিয়ে গেছে। উপজেলার সাতলা ব্রিজ নির্মাণের পর থেকেই কঁচা নদীর উজিরপুর অংশ অস্তিত্ব সংকটে পড়ে বলে মনে করেন শফিক তালুকদারসহ স্থানীয়রা।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শত বছরের ঐতিহ্য শ্রীমন্ত নদী এখন পরিচিতি পেয়েছে শ্রীমন্ত খাল নামে। কেননা শ্রীমন্ত নদীর কোনো অস্তিত্বই নেই সেখানে। প্রায় ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি উপজেলার তুলাতলী নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে কাঁঠালতলী, শিবপুর ও কালিগঞ্জ হয়ে বাকেরগঞ্জ পৌরসভার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর মাঝবরাবর অংশটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে একদিকে পাদ্রীশিবপুরের কানকী হয়ে পায়রা নদীতে এবং অন্যদিকে নেয়ামতি ও কালিগঞ্জ হয়ে বিষখালী নদীতে পতিত হয়েছে।

পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিজয় দাস বলেন, শ্রীমন্ত খালটি একসময় নদী ছিল। এখান দিয়ে একতলা লঞ্চ চলাচল করত। অথচ এখন সেই নদীতে নৌকাও চলাচল করে না। এ ছাড়া আবার দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারানোর পথে।

আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদী একসময় ঢাকা-গৌরনদী নৌরুটের একটি প্রধান যোগাযোগমাধ্যম ছিল। এক সময়ে এই রুটে রাজধানী, মহানগরী, মানসী ও নিউসান নামে চারটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্য পরিবরহন করতো। তবে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ার দুই মাস পর গৌরনদী-ঢাকা নৌ-রুটে লঞ্চ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ডুবোচর আর নদীশাসনের অভাবে ২২ কিলোমিটার পালরদী নদী এখন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দখল-দূষণসহ নাব্যতা সংকটে বড় কোনো পণ্যবাহী ট্রলারও ঢুকতে পারছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট লিংকন বাইয়েন বলেন, সরকারের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে একসময় ১৪০টি নদীর অস্তিত্ব ছিল। এসব নদী এখন দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। ডুবোচর, নদীর মুখে বাঁধ, ব্রিজ নির্মাণের কারণে নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রতিটি নদীর গতিপথ স্বাভাবিক করতে নদীশাসন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র বরিশাল বন্দর নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বরিশাল অঞ্চলের অনেক নদীপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর নেপথ্যে সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন বলা হলেও পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীতে নাব্যতা সংকট। বেশিরভাগ নদী ভাঙছে- আর কিছু নদীতে পলিপড়ে নাব্যতা হারাচ্ছে। যে কারণে ওইসব নদীতে লঞ্চ বা জাহাজ চলাচল করতে পারে না। নদীপথ সচল রাখতে ট্রেজিং জরুরি।

এ বিষয়ে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, নদী শাসন ব্যয়বহুল বিষয়। তবে আপাতত ছোট হয়ে যাওয়া নদীগুলো উদ্ধারে সরকারের কোনো পরিকল্পনা আমাদের কাছে নেই। তবে খাল খনন নিয়ে বড় প্রকল্প এবং প্রস্তাবনা আমরা দিয়েছি। নদী খনন বা হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশালের যেসব নদীতে বড় লঞ্চ চলত সেগুলো এখন ‘মরা খাল’
বরিশালে নাশকতার বৈঠকের অভিযোগে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী আটক
বরিশালে আ.লীগের ঝটিকা মিছিলে চাপ বাড়ছে পুলিশের
ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী: মহাসড়কের ২৯ কিমিতে খানাখন্দ
চিফ হুইপের গাড়িবহরে হামলার ৪ বছর পর গ্রেপ্তার ৬
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com