Current Bangladesh Time
Tuesday September ২৯, ২০২৬ ১:২৩ AM
Barisal News
Latest News
Home » বরিশাল » নার্সারিতে বদলে যাওয়া উপজেলা নেছারাবাদ
২৭ September ২০২৬ Sunday ৬:২৪:১৪ PM
Print this E-mail this

নার্সারিতে বদলে যাওয়া উপজেলা নেছারাবাদ


এম,এম,এইচ,চুন্নু ।। বিশেষ প্রতিনিধি:

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সুস্বাদু পেয়ারা ও সুপারি উৎপাদনের দেশজোড়া খ্যাতি তো ছিলই, তার ওপর নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছে ‘সবুজের রাজধানী’ কিংবা ‘নার্সারির জনপদ’ হিসেবে। 

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যতম বড় চারা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলা।

প্রায় দুই শতাব্দির পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী এই চারা উৎপাদন স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে দিয়েছে। পরিণত হয়েছে  হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার চালিকাশক্তিতে।

ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি

নেছারাবাদের নার্সারি শিল্পের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। স্থানীয়দের বংশানুক্রমিক দক্ষতা ও মাতুয়াইল-আটঘর কুড়িয়ানার অনুকূল আবহাওয়া ও পলিমাটিকে কাজে লাগিয়ে এ শিল্প পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

জমির পরিমাণ ও নার্সারির সংখ্যা
নেছারাবাদ উপজেলার প্রায় ৩৮টি গ্রামের ৫০০ হেক্টর কৃষিজমিতে গড়ে উঠেছে বড় বড় সব নার্সারি। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মিলিয়ে উপজেলায় ছোট-বড় মোট ৩৯৩টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নার্সারি রয়েছে।

বৈচিত্র্যময় চারা 

নেছারাবাদের নার্সারিতে উন্নত জাতের ফলদ (আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, মাল্টা, ড্রাগন ইত্যাদি), ফুল (গোলাপ, জবা, রজনীগন্ধা, বিদেশি ফুল), বনজ (মেহগনি, কড়ই, সেগুন) এবং বিরল প্রজাতির নানা ঔষধি গাছের চারা উৎপাদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়  বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি।

বর্ষা মৌসুমের কর্মযজ্ঞ ও বিপণন ব্যবস্থা 

বছরের অন্যান্য সময় পরিচর্যা চললেও বর্ষা মৌসুম আসার সাথে সাথেই পুরো নেছারাবাদ উপজেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরপরই চারা তোলা, নতুন প্লাস্টিক ব্যাগে মাটি ভরা, টব প্রস্তুত করা ও কলম বাঁধার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন হাজার হাজার উদ্যোক্তা ও শ্রমিক।

নেছারাবাদে উৎপাদিত মানসম্মত চারা কেবল পিরোজপুরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সড়ক ও নৌপথে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও ট্রলারভর্তি চারা সরবরাহ করা হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন  জেলায়। অনলাইন ও অফলাইন- উভয় মাধ্যমেই এখন এখানকার চারার বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে।

বহুমুখী কর্মসংস্থান 

একসময় যেসব এলাকার তরুণরা কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমাতেন, তারা এখন নিজ ভিটায় নার্সারি গড়ে তুলে আত্মকর্মসংস্থানের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।এই শিল্পের কারণে শত শত বেকার যুবক আজ সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন।

শ্রমিকদের জীবিকা 

নার্সারিতে প্রতিনিয়ত চারা নিড়ানি, পানি দেওয়া, চারা আটি বাঁধা এবং পরিবহনের কাজ করে সংসার চলছে বহু  মানুষের।

সহযোগী খাতের বিকাশ 

নার্সারিকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে পলিথিন ব্যাগ, জৈব ও রাসায়নিক সার, মাটির টব, বাঁশের খাঁচা ও সুতলির মতো আনুষঙ্গিক উপকরণের বিশাল বাজার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিক, পাইকারি চারা ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারাও এ থেকে প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হচ্ছেন।

কোটি টাকার বাণিজ্যিক লেনদেন ও সরকারি তথ্য পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পিরোজপুর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৪৩৭টি নার্সারি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৩টি নার্সারিই রয়েছে  নেছারাবাদে।

বছরে লেনদেন ও অর্থনৈতিক অবদান 

প্রতিবছর কেবল নেছারাবাদের নার্সারি খাত থেকেই প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার বিশাল বাণিজ্য হয়। স্থানীয় ব্যাংক, এনজিও ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রামীণ লেনদেনের একটি বড় অংশ আসে চারা বিক্রি থেকে, যা জেলার সার্বিক জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন 

অর্থনৈতিক লাভের বাইরেও নেছারাবাদের নার্সারি শিল্প পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও অসামান্য অবদান রাখছে। প্রত্যেক মৌসুমে এখান থেকে উৎপাদিত লাখ লাখ গাছের চারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রোপণ করা হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজায়নে বিরাট ভূমিকা রাখছে।

যা বলছেন উদ্যোক্তারা 

স্থানীয় এক নার্সারি উদ্যোক্তা বলেন, বর্ষা মৌসুম আমাদের ব্যবসার মূল সময়। এই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার ও সৌখিন বাগানপ্রেমীরা চারা কিনতে সরাসরি আমাদের এলাকায় আসেন। নার্সারি করেই আমরা স্বাবলম্বী হয়েছি এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি।

শ্রমিকের বক্তব্য 

নার্সারিতে কর্মরত এক দিনমজুর শ্রমিক জানান, সারা বছরই এখানে কম-বেশি কাজ থাকে, তবে বর্ষায় ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। এই নার্সারিতে দিনরাত কাজ করেই আমাদের সংসার ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ ভালোভাবে চলে যায়।

কৃষি কর্মকর্তার মতামত 

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, পিরোজপুর জেলার সিংহভাগ নার্সারিই নেছারাবাদভিত্তিক। বাণিজ্যিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রতিবছর এ খাত থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।

প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা 

দুই শতাব্দির দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য বুকে নিয়ে নেছারাবাদের নার্সারি শিল্প আজ কেবল একটি স্থানীয় ব্যবসা নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবন পরিবর্তনের রূপকার। তবে উদ্যোক্তাদের মতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ, চারা সংরক্ষণের সঠিক অবকাঠামো এবং উন্নত পরিবহন ও সুসংগঠিত বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই চারা রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব। 

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশালের যেসব নদীতে বড় লঞ্চ চলত সেগুলো এখন ‘মরা খাল’
বরিশালে নাশকতার বৈঠকের অভিযোগে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী আটক
বরিশালে আ.লীগের ঝটিকা মিছিলে চাপ বাড়ছে পুলিশের
ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী: মহাসড়কের ২৯ কিমিতে খানাখন্দ
চিফ হুইপের গাড়িবহরে হামলার ৪ বছর পর গ্রেপ্তার ৬
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com