ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া
 সাগরের স্রোতের তাণ্ডবে ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত (ছবি: আমাদের বরিশাল ডটকম)
বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের তাণ্ডব, মৌসুমী বালু ক্ষয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত। প্রতি বছর সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে সৈকতের ৩০ থেকে ৪০ ফুট বিলীন হচ্ছে। সাগরের অব্যহত ভাঙ্গনে সাগরকন্যা কুয়াকাটার সৈকতের প্রস্থ্য কমে দাঁড়িয়েছে ৫০০ ফুটে, কোন কোন স্থানে প্রস্থ্য ১৫০ ফুটেরও কম। অথচ মাত্র এক দশক আগেও এ সৈকতের প্রস্থ্য ছিল তিন কিলোমিটার। শুধু প্রস্থ্য নয়, প্রতিবছর সৈকতের দৈর্ঘ্যও কমছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গত ২০ বছরে এভাবে অন্তত দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার সৈকত বিলীন হয়ে গেছে।
কুয়াকাটা সৈকতের বেলাভূমের এ ভাঙ্গন ঠেকাতে ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে খেপুপাড়া পাউবো উপ-বিভাগীয় কার্যালয় থেকে প্রস্তাবনা আকারে ২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গত দশ বছরেও এ প্রকল্প সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়াস্থ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সফি উদ্দিন জানান, প্রকল্পটির ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত তাদের জানা নেই।
আর এ সিদ্ধান্তহীনতার বেড়াজালে পড়ে ক্রমশ বিলীন হচ্ছে সৈকতের নারিকেল বাগান, সংরক্ষিত ঝাউবন, তালবাগান, শালবনসহ কুয়াকাটার দর্শনীয় স্থানগুলো। এক জায়গায় বসে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বিরল দৃশ্য দেখা যাওয়ার জন্য প্রসিদ্ধ কুয়াকাটা সৈকত সুরক্ষায় কারও নজর নেই বললেই চলে।
 সাগরের বিক্ষুব্দ ঢেউয়ের তাণ্ডবে কুয়াকাটায় এলজিইডির রেষ্ট হাউজের ভেঙ্গে পড়া বাউন্ডারী দেয়াল ও পাশ্ববর্তী ঝিনুকের দোকান। ছবিটি ২০১১ সালের আগস্টে তোলা। পরবর্তীতে এ জায়গাগুলো সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিমে খাজুরা ও পূর্ব দিকে গঙ্গামতি পর্যন্ত সৈকত ভেঙে সরু হয়ে গেছে। সেখানকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অস্তিত্বও এখন বিলীন হওয়ার পথে। বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের প্রবল ঝাপটায় সৈকতের বালুস্তর ভেসে যাচ্ছে। অন্যদিকে লাশের মতো পড়ে আছে শত শত গাছ।
কিছু কিছু জায়গায় সৈকত ভেঙে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে। ভাঙন এতটাই ভয়াবহ যে সৈকত-লাগোয়া নারিকেল বাগানও ভাঙনের কবলে পড়েছে। এলজিইডির অত্যাধুনিক বাংলো কয়েক বছর আগেই বিলীন হয়েছে। আর বর্তমানে জোয়ারের সময় সৈকতে পর্যটকদের হাটার জন্য কোন জায়গা থাকেনা। ভাটার সময় পর্যটকরা সৈকতে হাঁটতে পারলেও তাও নির্দিষ্ট গন্তব্যের মধ্যে। অব্যাহত ভাঙ্গনে এখন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধও রয়েছে চরম হুমকির মধ্যে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে চিরচেনা সৌন্দর্যমণ্ডিত সাগরকন্যা কুয়াকাটা।
মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা সুরেন চন্দ্র শীল বলেন, কুয়াকাটা সৈকত প্রতিবছরই ভাঙছে। প্রতি বছর সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে সৈকতের ৪০ থেকে ৫০ ফুট বিলীন হচ্ছে।
কুয়াকাটা উন্নয়ন সোসাইটির (কেডিএস) নির্বাহী পরিচালক রুম্মান ইমতিয়াজ আমাদের বরিশাল ডটকমকে বলেন, প্রতিবছর জরুরী প্রকল্প গ্রহন করে এখানকার বেড়িবাঁধ রক্ষার চেষ্টা চলছে, কিন্তু সৈকত রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে বেড়িবাঁধসহ কোন কিছুই রক্ষা হবেনা, সব সাগর বক্ষে বিলীন হবে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সৈকত রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
পাউবো কুয়াকাটা সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ তালুকদার বলেন, ‘কুয়াকাটা সৈকতে ভাঙনের তীব্রতা নিয়ে আমরাও চিন্তিত। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (সিইআইপি) মাধ্যমে সৈকত রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভব না হলে আমরা অন্য কোনো উপায়ে অর্থের সংস্থান করে সৈকত রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক, সি-বিচ ম্যানেজমেন্ট ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সাগরের ভাঙন থেকে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় শীঘ্রই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |