বরগুনা পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট বরগুনা প্রতিনিধি
বরগুনা পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট বরগুনা পৌর শহরে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পৌর এলাকার দুই শতাধিক টিউবওয়েলের অধিকাংশেই পানি উঠছে না। ফলে খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির জন্য চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌরবাসী। বাধ্য হয়ে অনেকে বাইরে থেকে পানি কিনে আনছেন। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
পৌরসভা সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরগুনা পৌর এলাকায় আনুমানিক ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে পৌরবাসীর পানির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ লিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয় বলে পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে। অতিরিক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে পৌর এলাকার টিউবওয়েলগুলোতেও।
বেসরকারি হিসাবে পৌর এলাকায় থাকা দুই শতাধিক টিউবওয়েলের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি সচল রয়েছে। এসব টিউবওয়েল থেকেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে অনেক পরিবারকে দূরবর্তী এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সগীর (পাইপ সগীর) বলেন, পৌর শহরের তিন-চার বাড়ি পরপর একটি করে টিউবওয়েল রয়েছে। এতদিন এসব টিউবওয়েল থেকেই খাবার পানি সংগ্রহ করতাম। এখন কোনো টিউবওয়েল থেকেই পানি উঠছে না। এতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে।
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইমরান ও নোমান বলেন, এলাকার কোনো টিউবওয়েল দিয়ে পানি না ওঠায় পৌরসভার বাইরে থেকে পানি আনতে হচ্ছে। প্রতি কলস পানি আনতে ২০ টাকা দিতে হয়। টাকা দিয়েও অনেক সময় পানি পাওয়া যায় না।
পিটিআই এলাকার বাসিন্দা খলিল বলেন, আমাদের বাসার সামনে একটি টিউবওয়েল ছিল। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এলাকাবাসী ওই টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করেছে। কিন্তু এখন আর পানি ওঠে না।
পৌর শহরের ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, সারা দিনে যে পানি পাই, তা দিয়ে দুজন মানুষের গোসলও হয় না। বাধ্য হয়ে ৩০ টাকা দিয়ে এক কলস পানি কিনে চাহিদা পূরণ করতে হয়।
একই এলাকার বাসিন্দা মো. শিমুল বলেন, পানি সংকটের কারণে পৌর শহরে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত এর সমাধান প্রয়োজন।
পৌরবাসীর পানির সংকট নিরসনে কয়েক বছর আগে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের বাগানবাড়ি রোড ও থানাপাড়া রোড এলাকায় দুটি উঁচু জলাধার নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি জলাধারের ধারণক্ষমতা ১০ লাখ লিটার। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জলাধার দুটির উদ্বোধনও করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এগুলো থেকে নিয়মিত পানি সরবরাহ শুরু হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এলজিইডি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে জলাধার দুটির নির্মাণকাজ শুরু করে বরগুনা পৌরসভা। পানি সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে এগুলো নির্মাণ করা হলেও কার্যকরভাবে চালু না হওয়ায় এর সুফল পাচ্ছেন না পৌরবাসী।
পৌরসভার আমতলাপাড় এলাকার বাসিন্দা আল মামুন বলেন, পৌরসভার কোনো টিউবওয়েল থেকেই এখন ঠিকমতো পানি ওঠে না। এ কারণে তীব্র পানি সংকটে আছি আমরা। উঁচু জলাধার দুটি চালু করা হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বিকল্প উৎস হিসেবে নির্মাণ করা জলাধার দুটি থেকেও পানি সরবরাহ শুরু হয়নি। ফলে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বরগুনা পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ১৯৯৮ সালে শহরের ক্রোক এলাকায় খাকদোন নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহের উদ্দেশ্যে একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে সে সময় গ্রাহকসংখ্যা কম থাকায় পরিচালন ব্যয় তুলতে না পারায় ২০১২ সালে শোধনাগারটি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর থেকে পৌরসভা ক্রমেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে পৌর এলাকার ব্যক্তিগত ও সরকারি টিউবওয়েলগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের পানির সংকটও অনেকটা দূর হবে।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সাবেক নেতা ও বরগুনা পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুরাদ খান বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকট দূর করতে দুটি উঁচু জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু পাইপলাইনে সমস্যার কারণে এগুলো থেকে পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আমরা এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
বরগুনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শিশির কুমার বিশ্বাস বলেন, পানি পরিশোধনাগারটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি চালু করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। একই সঙ্গে পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকটও অনেকটা দূর হবে।
পৌরবাসীর দাবি, টিউবওয়েলে পানি না ওঠা এবং বিকল্প পানির ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। তাই দ্রুত উঁচু জলাধার দুটি চালু, বন্ধ থাকা পানি শোধনাগার সংস্কার এবং নিরাপদ পানি সরবরাহের স্থায়ী ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশালে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
বরিশালের নতুন ডিআইজি জুলফিকার আলী
প্রার্থী চূড়ান্ত করল বিএনপি, রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন মির্জা ফখরুল
তিন সন্দেহে বরিশালে মাঠে পুলিশ, হেমায়েতপুরে জেএমবির আস্তানায় অভিযান