Current Bangladesh Time
Tuesday May ২৬, ২০২৬ ৪:১৮ AM
Barisal News
Latest News
Home » পর্যটন » লাইফস্টাইল » এভারেস্ট বেজক্যাম্প অভিযানের ৭ স্মৃতি
২৯ May ২০২২ Sunday ৯:৩৬:০৬ PM
Print this E-mail this

এভারেস্ট বেজক্যাম্প অভিযানের ৭ স্মৃতি


আজ এভারেস্ট দিবস

মনিরুল ইসলাম পান্নু

এ পথেই আছে এভারেস্ট
ছবি: লেখক

ভারতের সান্দাকফু থেকে ফালুট ট্র্যাক করার পর আত্মবিশ্বাস গেল বেড়ে। ২০১৯ সালে খুঁজতে শুরু করলাম এ রকম আর কোথায় যাওয়া যায়। থাকা-খাওয়ার সুবিধার কথা চিন্তা করে ইবিসিতে (এভারেস্ট বেজক্যাম্প) যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। ২০২০ সালের মার্চে যাব, এ রকমই কথা। কিন্তু ‘ভাগ্যের লিখন’ বলেও তো একটা কথা আছে! করোনা শুরু হলো। দুই বছর জীবন থেকে হারিয়ে গেল, যাওয়া আর হয়ে উঠল না। অবশেষে ২০২২ সালে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অফিস থেকে ছুটি মিলল, ফ্লাইটের টিকিট ও ভিসারও ব্যবস্থা হয়ে গেল। তারপর শুরু হলো দিন গোনা—কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।

মার্চের শুরুতে হিমালয়ের ডাক আর উপেক্ষা করা গেল না। ঢাকা থেকে উড়োজাহাজে চেপে হাজির হলাম কাঠমান্ডু।

লুকলা এয়ারপোর্ট

বোর্ডিং পাস নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন ডাক পড়বে। যাব লুকলা, ইবিসি ট্র্যাকের প্রবেশদ্বার। এই ট্র্যাকের ভয়ংকরতম অংশ হচ্ছে কাঠমান্ডু থেকে লুকলা যাত্রা। ১৪ সিটের উড়োজাহাজগুলো তো ভয়ংকর বটেই, তার চেয়েও ভয়ংকর তেনজিং-হিলারি বিমানবন্দরের রানওয়ে, যা লুকলা বিমানবন্দর নামে বেশি পরিচিত। ১৯৬৪ সালে স্যার এডমন্ড হিলারির তত্ত্বাবধানে এই বিমানবন্দর তৈরি হয়। পাহাড়ের বুকে মাত্র ১ হাজার ৭২৯ ফুট রানওয়ের একটি বিমানবন্দর কতখানি বিপজ্জনক হয়, তা সহজে অনুমান করা যায়!

নামচে বাজার থেকে থিয়াংবোচে যাওয়ার পথে
ছবি: লেখক

ককপিটের কাছের সিটে বসলাম। আমার আর পাইলটের মাঝে স্বচ্ছ একটা পলিথিন। ৩০ মিনিট ওড়ার পর দক্ষ পাইলট সহিসালামতে বিশ্বের বিপজ্জনক বিমানবন্দরগুলোর একটিতে নামিয়ে দিলেন। শেষ হলো ভয়ংকর ও রোমাঞ্চকর এক বিমানযাত্রা।

মণি পাথর

সকালের খাবার খেয়েই নেমে পড়লাম ট্রেইলে। আজ আমাদের গন্তব্য ফাকদিং। লুকলা থেকে আট কিলোমিটার দূরে আর উচ্চতা ২ হাজার ৬১০ মিটার। এর অর্থ দাঁড়াল আজ কিছুটা নিচে নেমে যেতে হবে। ট্র্যাক শুরু হতে না হতেই চলে এলাম খুম্বু পাসাংলামু রুরাল মিউনিসিপ্যালিটির কার্যালয়ে। এখান থেকে দুই হাজার রুপির বিনিময়ে অনুমতিপত্র নিয়ে নিলাম। এরপর শুরু হলো চড়াই-উতরাই পেরোনো।

এটুকু পথে সবচেয়ে অভিভূত হলাম ‘মণি স্টোন’ দেখে। পাথরে খোদাই করে লেখা ‘ওম মণি পদ্মে হুম’। চার শব্দের এই মহামন্ত্র বেশির ভাগ তিব্বতি প্রার্থনা পতাকায় দেখা যায়। আসলে এটা হলো একটা প্রাচীন বৌদ্ধ মন্ত্র, যার অর্থ ‘পদ্মের অন্তস্তলে থাকা রত্নের প্রশস্তি’। আরও অনেক তিব্বতি মন্ত্রই লেখা থাকে এই পাথরগুলোতে। বৌদ্ধধর্মের আচার অনুযায়ী দেয়ালের বাঁ দিক দিয়ে হেঁটে যাওয়া ভালো। মণি স্টোনের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হওয়ার আগে আগেই পৌঁছে গেলাম ফাকদিং।

হিলারি ঝুলন্ত সেতু

হিমালয়ের এ দিকটায় সকাল সকাল ট্রেইলে বেরিয়ে পড়া ভালো। তাতে তেজদীপ্ত সূর্য আর ঠান্ডা বাতাসের কবল থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যায়। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বেরিয়ে পড়লাম পথে। আজকের গন্তব্য নামচে বাজার। নামচে বাজার যেতে পার হতে হবে হিলারি সেতু। পুরো ট্র্যাকে ৯টি ঝুলন্ত সেতু পার হতে হয়। আমি উদ্‌গ্রীব হয়েছিলাম এই হিলারি সেতুটি দেখার জন্য। দুধকোশী নদীর ওপরে এই সেতুর উচ্চতা প্রায় ১২৫ মিটার। যতটুকু জানা যায়, ২০১৩ সালে সেতুটি তৈরি করা হয়। এর নিচে পুরোনো সেতুটি এখনো অক্ষত রয়েছে। সংগত কারণেই পুরোনো সেতু এখন আর ব্যবহার করা হয় না। প্রচণ্ড বাতাসের কারণে সেতুর ওপর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাওয়া কষ্টকর।

থিয়াংবোচে বৌদ্ধ মন্দির ও আশ্রম
ছবি: লেখক

থিয়াংবোচে আশ্রম

শেরপাদের রাজধানী নামচে বাজার থেকে আজ হাঁটব থিয়াংবোচে পর্যন্ত। এই গ্রামের আশপাশে শেরপাদের বসবাস। থিয়াংবোচে মনাস্ট্রি বা আশ্রমের কারণে এই গ্রাম বেশি পরিচিত। ১৯১৬ সালে লামা গুলু মনাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করেন। মনে করা হয়, এটাই এই খুম্বু অঞ্চলের সবচেয়ে পুরোনো মনাস্ট্রি। পুরোনো মনাস্ট্রিটি এখন আর নেই। ভূমিকম্প ও আগুন লাগার কারণে ধ্বংস হয়েছে বারবার। এখন যে কাঠামোটি আছে, তা ১৯৮৯ সালে করা এবং নতুন করে তৈরি করাতে স্যার এডমন্ড হিলারির বেশ অবদান আছে।

পৌঁছেই দৌড়ে গেলাম হেলিপ্যাডে। এখান থেকে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ দেখা যায়। পাহাড়ের আড়ালে সূর্য কীভাবে লুকায়, সেই দৃশ্য মিস করা যায় না। এ যেন এক স্বর্গরাজ্যে চলে এলাম। নুপৎসে, লোৎসে, আমা-দাবলাম, থামশেরকুর মতো সব সাদা পাহাড় এত কাছ থেকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকলাম।

রডোডেনড্রনকে নেপালে বলে লালিগুরাস
ছবি: লেখক

ফুলের নাম লালিগুরাস

মনাস্ট্রির সামনে কলকাতার গৌতম দাদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ গপ্পো করে ডিংবোচের পথ ধরলাম। পথের দুধারে রডোডেনড্রনের বাগান মাঝখান হেঁটে এগোচ্ছি। বাগানের পুরোটাই তুষারের মোটা আস্তরণে সাদা ফকফকা হয়ে আছে। এমনিতেই আমার হাঁটার গতি শ্লথ, তার মধ্যে পথের ওপর বরফ পড়ে শক্ত হয়ে আছে, যা হাঁটার গতি আরও শ্লথ করে দিয়েছে। রডোডেনড্রনগাছগুলোতে অজস্র কলি। রবীন্দ্রনাথ যাকে আমাদের কাছে রডোডেনড্রন নামে পরিচয় করে দিয়েছেন, নেপালে তাকে বলে লালিগুরাস। লালিগুরাস নেপালের জাতীয় ফুল। হাঁটছি আর ভাবছি, এই না ফোটা কলিরা যখন একসঙ্গে ফুটে উঠবে, কত-না সুন্দর লাগবে। যদিও ফেরার পথে কিছু ফোটা লালিগুরাস দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।

বাংলাদেশের পর্বতারোহী সজল খালেদের স্মরণে স্মৃতিফলক
ছবি: সংগৃহীত

দুঃখজনক স্মৃতির পাস

ডিংবোচেতে এসে বেশ ভালোই ঠান্ডার কবলে পড়েছি। ৪ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় উঠে এসেছি। এখান থেকে পথচলা শুরু হলো লোবুচের উদ্দেশে। কিন্তু আমার মনোযোগ পড়ে রয়েছে থুকলা পাসের ওপরে। থুকলা পাসকে বলা হয় ইবিসি ট্র্যাকের শেষ বাধা, তার ওপর রয়েছে সজল খালেদের মতো শতাধিক পর্বতারোহীর স্মৃতিস্তম্ভ। যাদের সবাই কোনো না কোনোভাবে এভারেস্ট আরোহণ করতে এসে মৃত্যুবরণ করেছেন। সব স্মৃতিস্মারক দেখা সম্ভব না হলেও সজল খালেদেরটা দেখব, এ সিদ্ধান্ত ঢাকা থেকেই নিয়ে এসেছিলাম। সজল খালেদ ২০১৩ সালের ২০ মে এভারেস্টের শীর্ষে পা রেখে নিচের দিকে নামার সময় দুর্ভাগ্যবশত মৃত্যুবরণ করেন। তারপর একে একে দেখলাম রব হল, স্কট ফিশারের মতো বিখ্যাত সব পর্বতারোহীদের স্মৃতিস্তম্ভ। দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে শ্লথগতিতে লোবুচের পথ ধরলাম, যেখানে শেষ হবে আজকের পথচলা।

এভারেস্ট বেজক্যাম্পে লেখক
ছবি: সংগৃহীত

এভারেস্ট বেজক্যাম্প ৫৩৬৪ মিটার

লোবুচে এসে চার দিন পর গোসল করলাম। গরম পানি থাকায় অনেক সময় নিয়ে গোসল করে ফ্রেশ হলাম। ভাবখানা এমন, চার দিনের গোসল এক দিনে করে ফেলব। আসলে ব্যাপারটা মোটেও সে রকম নয়। ভালো করে নিজেকে তৈরি করে নিলাম। কেননা, পরদিন সকালে গোরাকশেপের উদ্দেশে পথ হাঁটব। গোরাকশেপে দুপুরের খাবার খেয়েই আবার ছুটব, গন্তব্য এভারেস্ট বেজক্যাম্প।

বেশ কষ্ট হচ্ছিল। অক্সিজেনের স্বল্পতা, ঠান্ডা, প্রচণ্ড বাতাস আর নতুন যোগ হয়েছে বড় বড় পাথর। এভাবে একসময় খুম্বু হিমবাহের গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম গোরাকশেপ। দুপুরের খাবারের পর শুরু হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের হাঁটা। স্বপ্নের দোরগোড়ায় বসে আছি, এখন শুধু দোর খুলে ছুঁয়ে দেওয়া বাকি। খুব একটা দূরে নয়, মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ। কিন্তু আপাতদৃষ্টে এই তুলনামূলক সহজ পথও দুরূহ করার জন্য অক্সিজেনের স্বল্পতাই যথেষ্ট। যাহোক, কষ্টে–সৃষ্টে পৌঁছে যাই একটা বড় পাথরের সামনে। যাতে লাল রং দিয়ে লেখা, ‘এভারেস্ট বেজক্যাম্প ৫৩৬৪ মি.’। পাথরটা ছুঁয়ে দেখি। হ্যাঁ, এখন আমি স্বপ্নযাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে শ্বেতশুভ্র হিমবাহ পাথরটিকে ঘিরে রেখেছে। অনেক রংঢং করে ছবি তুললাম আর ভাবতে থাকলাম এই মুহূর্তের আনন্দ ও পথের দুর্গমতা কোনোটাই প্রকাশ করার জন্য এই ছবি যথেষ্ট নয়।


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বদর দিবস ও সমকালীন বিশ্ব: ঈমানি শক্তিতে জেগে ওঠার আহ্বান
জানের প্রস্তুতি ও সফল সিয়াম সাধনার পূর্ণাঙ্গ
শবেবরাতে আমল ও ফজিলত
‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত
পুরনো রূপে ফিরছে লাকুটিয়ার জমিদার বাড়ি
ভালো নেই বরিশালের তবলা শিল্প
” মাটির সাথে কৃষকের মেলবন্ধন ” – বাঙালির ঐতিহ্য “‘নবান্ন উৎসব “
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com